সোমবার, মে ২০, ২০২৪
সাহিত্য

ইতিহাসে মে দিবসের ভূমিকা

বিমল কান্তি দাস: এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টা (কর্ম-দিবস) কমানো। পরবর্তীতে এ আন্দোলনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মে দিবসের সকল ইতিহাস। কাজের ঘণ্টা কমাবার এ দাবী শ্রমিক শ্রেণির কাছে ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা ব্যবস্থা চালু হবার পর থেকেই কাজের ঘণ্টা কমাবার এ আন্দোলনের প্রকাশ দেখা যায়। প্রধানত মজুরি বাড়াবার দাবিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমদিকে ধর্মঘটগুলো শুরু হয়। সেখানে ১৮৮৫-৮৬ সালে যতগুলো ধর্মঘট হয়েছে তার সঙ্গে পূর্ববর্তী বছরের ধর্মঘটের সংখ্যা তুলনা করলেই বোঝা যায়, কী অভূতপূর্ব সংগ্রামী চেতনা তখন শ্রমিকদের ছিল। ১৮৮১ সাল থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরে গড়ে ৫০০ ধর্মঘট হয়, আর এগুলোতে অংশগ্রহণ করে গড়ে ১ লক্ষ ৫০ হাজার শ্রমিক। পরবর্তী বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ এবং সেই ধর্মঘটে যোগদানকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ২ লক্ষ ৫০ হাজার। যখনই শ্রমিকরা নিজেদের দাবী দাওয়া নিয়ে তাদের কোন দলিলে-লিফলেটে লিপিবদ্ধ করছে বিশেষ করে তখনই কাজের ঘণ্টা কমানোর, সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার তাগিদ সেই দলিলে স্থান পেয়েছে। একদিকে কাজের ঘণ্টা কমানো ও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের আন্দোলন বাড়তে থাকে, অন্যদিকে মালিকের শোষনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। কাজের ঘণ্টা অত্যাধিক বেশী হওয়ায় অমানুষিক চাপে শ্রমিকরা যেমনি পিষ্ট হতে লাগলো ঠিক তেমনি নির্যাতন ও শ্রম-যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তির দাবীতেও শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়তে লাগলো। সকল প্রকার শোষণ থেকে চিরস্থায়ী মুক্তির প্রশ্নও তখন শ্রমিক শ্রেণির চেতনায় আসতে থাকে।

‘সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত’- এই ছিল তখনকার দিনে কাজের ঘণ্টা। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। চৌদ্দ, ষোল এমনকি আঠারো ঘণ্টা কাজের দিনও তখন চালু ছিল। ১৮০৬ সালে “ফিলাডেলফিয়ার” ধর্মঘটী জুতা কারখানার শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে মালিক পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। তখন শ্রমিকদের ১৯ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত খাটানো হচ্ছিল, তা পরবর্তী মেহনতি মানুষের মুখপত্র (ওয়ার্কিং মেনস্ অ্যাডভোকেট) নামক পত্রিকায় প্রকাশ পায়। ১৮২০ সাল থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবীতে ধর্মঘটের পর ধর্মঘট তখন চলছিল। দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম চালুর সুনির্দিষ্ট দাবি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে উঠতে থাকে।

১৮২৭ সালে ইংল্যান্ডের ফিলাডেলফিয়ার মেকানিকদের নিয়ে বিশ্বে প্রথম ট্রেড ইউনিয়নের জন্ম হয়। ১৮৩৪ সালে নিউইয়র্কে রুটি কারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট চলতে থাকে। গৃহনির্মাণ শ্রমিকরা ১০ ঘণ্টা কাজের দাবীতে একের পর এক ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বসে। নিউইয়র্ক, বাল্টিমোর, ওয়াশিংটন, মিলওয়াতি, সিনসিনাটি, সেন্ট লুই, পিটার্সবার্গ – এইসব অঞ্চলে দশ ঘণ্টা কাজের দাবির আওয়াজ দ্রুত বেগে একটা তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনের মত দাবানল আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

অতঃপর ১৮৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভ্যান ব্যুরেনের আমলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরকারি কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য ১০ ঘণ্টা কাজের সময় বেঁধে দিতে বাধ্য হয়। এই আইন দুনিয়ার সমস্ত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আন্দোলনকে সম্প্রসারিত করার সংগ্রামে পরবর্তী যুগে একটানা চলতে থাকে। ১৮৫০ সাল পরবর্তী বছরগুলোতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রবল উদ্দীপনা দেখা দেয়। ইতিমধ্যে মার্কস ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশ ও প্রচার শুরু হয়ে গেছে। কয়েকটি শিল্পোন্নত দেশে কমিউনিস্ট পার্টিও গড়ে তোলা শুরু হয়েছে। এর সাথে সাথে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি ক্রমশ জোরদার হতে থাকে।

১৮৫৭ সালে পুঁজিবাদের সংকটকালে এই আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হলেও কয়েকটি সুসংগঠিত শিল্প কলকারখানায় এই দাবী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছিল। কাজের ঘণ্টা কমানোর আন্দোলন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে তা নয়, উদীয়মান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় অবাধ প্রতিযোগীতার যুগে বুর্জোয়া শ্রেণির ঊষালগ্নে যেখানেই শিল্পের বিকাশ সম্প্রসারিত হয়েছে, শ্রমিকরা নিষ্পেষিত হয়েছে, সেখানেই এ আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। সুদূর অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে গৃহ নির্মাণ শ্রমিকরা একই আওয়াজ তুলেছিল, ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা আমোদ প্রমোদ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম।’ এই দাবির পক্ষে বিশ্বের দেশে দেশে সাধারণ জনগণ তখন যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

 

যেভাবে মে-দিবস সংগঠিত হয়েছিল

১৮৮৬ সালের ১লা মে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আমেরিকার হে মার্কেটে দর্জী শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরী, নিরাপদ কর্মপরিবেশসহ বেঁচে থাকার দাবীতে বিক্ষোভ করে। মালিক শ্রেণির পেটোয়া বাহিনী অস্ত্র ও বোমা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর। অসংখ্য শ্রমিককে গুম ও হত্যা করা হয়। বিচারের নামে প্রহসনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয় স্পাইজ, এঙ্গেলস, ফিসারসহ অসংখ্য শ্রমিক নেতাদের। তখন থেকেই লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে দাবী আদায় শুরু হয় আট ঘণ্টা কর্মদিবসের। শ্রমিক নেতাদের বিনা বিচারে জেল-জুলুম-ফাঁসির বিরুদ্ধে ১৮৮৯ সালে সর্বহারার মহান নেতা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এর সভায় বিশ্বব্যাপী একই দিনে মে দিবস পালনের প্রস্তাব সিন্ধান্তাকারে গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক একসাথে বিশ্বব্যাপী মে দিবস পালিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে।

আজ ১৩৮ বছর পরেও আমাদের দেশের শ্রমিকরা এতো কম মজুরি পায় যে, দিনে ৮ ঘণ্টা নয়, ১২ ঘণ্টা থেকে ১৬ ঘণ্টা (ওভারটাইম সহ) কাজ না করলে তার পেট চলে না। কারখানা ও মেশিনপত্রের উন্নয়ন হয়েছে। শ্রমের উৎপাদনশীলতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শিল্পে উৎপাদন ও মুনাফা (মালিকের) বহুগুণ বেড়েছে কিন্তু শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির এত উন্নয়নের পরও শ্রমঘণ্টা কমানো হচ্ছে না। প্রযুক্তির যত উন্নয়ন হচ্ছ তার কোন ভাগ শ্রমিকরা পাচ্ছে না। প্রযুক্তির এত বিশাল উন্নয়নের পর শ্রমদিবস (শ্রমঘণ্টা) তো ৪ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিৎ ছিল না। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে তাল রেখে শ্রমঘণ্টাও কমাতে হবে। বাঁচার মত মজুরি দিতে হবে। আমরা শ্রমিকদের জন্য এমন মজুরি চাই যাতে ৮ ঘণ্টা কাজ করেই তার সংসার চালাতে পারে। আমরা তাই শ্রমিকদের জন্য ২০ হাজার টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি দাবি করছি।

দেশের ইতিহাসে সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনে শ্রমিক কর্মচারীদের আত্নহত্যাগের রক্তে সিক্ত। তাদের রক্ত ঘামে গড়ে উঠেছে এই দেশ। অথচ স্বাধীন দেশে তাদের নেই জীবন-জীবিকার অধিকার, কাজের অধিকার, ন্যায্য মজুরির অধিকার, সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার, ট্রেডইউনিয়ন করার অধিকার। এর কোনটাই এখনও পর্যম্ত পায়নি তারা। অন্যদিকে কলে-কারখানার শ্রমিক ছাড়াও রয়েছে রিক্সা শ্রমিক, অটোরিক্সা শ্রমিক, সি.এন.জি চালক, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, প্রাইভেটকার চালক, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, রংমিস্ত্রী, মৎস্যজীবী, দিনমজুরসহ অনেক শ্রেণি পেশার শ্রমিক, যাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পরিচয়পত্র, নিয়োগপত্র, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। আছে শ্রমিকদের উপর পুঁজিপতি মালিক শ্রেণির নির্মম শোষণ ও অত্যাচার। এ ছাড়াও আছে ভবন ধ্বসে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ইত্যাদি। শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, নামে-বেনামে তোলাবাজি, অবৈধ টোল আদায়, ঘরে বাহিরে নারী শ্রমিকদের উপর যৌন হয়রানিসহ জীবন জীবিকার বহুবিধ সমস্যায় তাদের দিন কাটে। হতাশায় ঘেরা দুর্বিসহ এক স্বপ্নহীন জীবন বয়ে চলে বছরের পর বছর। তাদের জীবনে বড় অভিশাপ হলো বেকারত্ব ও কম মজুরি যা পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থার অমোঘ ফল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব মতে দেশে বর্তমানে কর্মযোগ্য বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের বেতন (মজুরি) নির্ধারনে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা আই.এল.ও (ও.খ.ঙ.) এর নীতিমালায় স্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশে সরকার শ্রমিকদের মনুষ্যোচিত মজুরি নির্ধারনে ব্যার্থ। এবং কোথাও এর বাস্তবায়নে ন্যূনতম ভূমিকা পালন করেনি। বরং মালিকদের সুরে সুর মিলিয়ে শ্রমিক-ঠকানোর কাজে সহায়তা করে যাচ্ছে সরকার ও রাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, একের পর এক শ্রমিকদের আইনী অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। মালিক ও পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষে কালো কালো আইন তৈরি করে চলেছে। গত সরকার ও এই সরকারের আমলে যতবার শ্রম-আইন সংশোধন করা হয়েছে তা শ্রমিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। আবারো শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলছে – এবারো শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। ইতিমধ্যে শ্রমিকদের প্রায় ৭০ ভাগ আইনী অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমলে যতটুকু অধিকার ছিল স্বাধীন দেশে শ্রমিকদের সেই অধিকারটুকু রাখা হয়নি। শ্রমিকদেরকে এক ধরনের ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়েছে।

১৯৯০ এর দশকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিপর্যয়ের পর থেকে দেশে দেশে ধনতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় শ্রমিক শোষণ বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকশ্রণি খুব বেশি বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর শেষ কোথায়? মে দিবসের চেতনায় দুর্বিসহ বর্তমানকে দূরে ঠেলে নিজেদের পরিবার ও সমাজ উজ্জল ভবিষ্যতের অন্বেষণে সংগ্রাম করে চলছে। বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, আর শ্রমিক শ্রেণির এ সংগ্রামে বিশ্বময় অনুপ্রাণিত করে চলেছে মহান মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির এই আন্তর্জাতিক ঐক্য ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে সংগ্রাম, এগিয়ে যাবে মানব সভ্যতা। মে দিবসের শহীদেরা লাল সালাম।

লেখক
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি

RSS
Follow by Email