Fri, 20 Oct, 2017
 
logo
 

পাঞ্জাবির বয়স যখন বাইশ!

এটিএম জামাল: ম্যানেকুইনে পড়ানো পাঞ্জাবিটির বয়স কত আন্দাজ করা যায়? যিনি পাশে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি তোলছেন তিনি এই পোশাকটির মালিক। দীর্ঘ বাইশ বছর তিনি পরম যত্নে ব্যবহার করে এর প্রস্তুতকারক নকশা'র কাছে আজ অনন্য উপহার হিসেবে দিয়ে গেলেন!

কতটা মমতা ছিলো তার এই পাঞ্জাবিটির উপর? বলা মুশ্কিল। তবে আমার হাতে যখন বাইশ বছর পর পাঞ্জাবিটি ফিরিয়ে দিচ্ছিলো তখন আমি দেখেছি তার চোখে মুখে কি অপার ভালোবাসা! এছাড়া আমরা এর তৈরীকারক হিসেবে কিছুটা বোঝতে পারি। আমাদের হাতে তৈরী প্রতিটি পোশাক বরাবর প্রিয় বিষয়। এর যত্ন আমাদের অন্তরের গভীরতম প্রদেশ থেকে ওঠে আসে। যখন কোনো পোশাক ক্রেতার হাতে অর্পণ করি ঠিক তখন অনুভব হয় অন্যরকম ভালোবাসা। তাই এর যত্ন ও ব্যবহার বিধি বিশেষ করে ওয়াসের বিষয় বার বার বলে দেই। যেনো কোনো ত্রুটি না হয় কখনো। পোশাকটি যেনো অক্ষত থাকে, ব্যবহারের উপযোগী থাকে বহুদিন। প্রতিটি সুন্দর পোশাক তার সম্ভ্রান্তের পরিচয় বহন করে।
তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়, তারপর প্রসেস, রঙ ধাপে ধাপে গিয়ে হয় নানা ধরণের পোশাক। আধুনিক হাল ফ্যাশনে পোশাক অধিকতর আকর্ষনীয় করে তোলার লক্ষ্যে এখন রঙিন কারুকাজ করে থাকি বিভিন্ন মাধ্যমে। কখনো আদি ব্লক প্রিন্টে, অধুনা স্ক্রিনপ্রিন্ট বা কখনো হাত কিংবা মেশিন এম্ব্রয়েডারি রেশমি সুতা দিয়ে। এই সব মিলেমিশে পোশাকের বিষয়টি একেবারে হালকা করে দেখার কিছু নেই। যদি এর টেকসই বাড়াতে চাই। কাপড়ের টেকসই বাড়ানোর জন্য অবশ্যই ওয়াস বা ডিটারজেন্ট কোন মাত্রায় সহনীয় তা বিবেচনার বিষয়। সব কাপড়ে কিংবা সব মাধ্যমের ডিজাইন এক মাত্রার ডিটারজেন্ট ব্যবহার অবশ্যই ভালো নয়। কাপড় ধোয়ার বিষয়টি আনপড় বুয়াদের হাতে ছেড়ে দেয়া একেবারে ঠিক নয়।
আমার বাল্য বন্ধু বর্তমান গ্রুপ ক্যাপ্টেন, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, এনডিসি, ডিরেক্টর, বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স, তখন ১৯৯৪ সনে নারায়ণগঞ্জে নকশা'র উদ্যোগে প্রথম পোশাক প্রদর্শনী করা হয়, ঢাকা থেকে এসে প্রদর্শনীস্থল নারায়ণগঞ্জ পৌর পাঠাগার থেকে জহিরুল ইসলাম চৌধুরী যার ডাক নাম আমার নামে নামে জামাল এই পোশাকটি ক্রয় করে। বোধহয় আমার কোনো ঘোর শত্রুও বলবেনা বাইশ বছর আগের আমাদের এই ডিজাইন, এই কাটিং, রেশমের রঙ ও সেটিং বাইশ বছর পরও অচল কিংবা বর্তমান উপযোগী নয়।
যিনি এই সুতি পাঞ্জাবির কাপড় আমাকে সাপ্লাই করেছিলেন তিনি মিরপুরের একজন ব্যবসায়ী। মানিকগঞ্জ তাঁত পাড়া থেকে এই কাপড় তিনি তৈরী করে এনেছিলেন। আমার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেন আমার বড় দুলাভাই হুমায়ূন ইউসুফ চৌধুরী, হেলেন। এরপর এই কাপড় আমি তার থেকে বহুবার এনেছিলাম।
বরাবর আমার বন্ধু সৌভাগ্য খুবই চমৎকার। তারা আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমিও খুব সাবধানে এর যত্ন নেই। আমার স্মরণ শক্তি খুব একটা ভোঁতা নয়। এই পঞ্চান্ন বছরের শুরুতে বিগত সময়ের ভালো লাগা স্মৃতিগুলো আমার প্রাণ চাঞ্চল্য বাড়িয়ে দেয়। মনে হয় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকেও বহু বছর সচল রাখার রসদ জোগায়।
জামাল চাকুরী সূত্রে দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। দেশের প্রতিটি জায়গা থেকে তার দাওয়াত এসেছিলো। আমি তখন নকশা'র কাজে বুদ হয়ে আছি। কাজ আমার খুবই প্রিয় বিষয়। সারাটাদিন রাত আমার কাজের মধ্যে একটানা সময় কাটে। ঐ সময় বাহিরের সূর্যের আলো হঠাৎ হঠাৎ দেখে আমি কখনো কখনো অবাক হতাম। আরে, এত ঝক ঝকে আমাদেরর এই সবুজ-শ্যামল বসুধা! যদিও ব্যবসায়িক বুদ্ধি আমার কম। অর্থনৈতিক সফলতা শুধু কাজ দিয়ে আসে না। তার জন্য অনেক বুদ্ধির প্রয়োজন। যা আমার একেবারে নেই।
তবে হ্যাঁ, পরিশ্রম একেবারে নিরর্থক নয়, এই যে ভালোবাসা! দীর্ঘ বাইশ বছর পোশাকটি ধরে রেখেছে পরম মমতায়, ভালোবাসায়! গর্ব করেছে জামাল তার কর্মজীবনের বন্ধুদের কাছে, তার আত্মীয় পরিজনের কাছে, দেখো আমার বন্ধুর প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া, নকশা'র থেকে নেয়া!
এ কি আমার জন্য কোনো অংশে কম, জামাল?

পাঞ্জাবির বয়স যখন বাইশ!লেখক: ফ্যাশন ডিজাইনার

নকশা’র প্রতিষ্ঠাতা

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম