Fri, 24 Mar, 2017
 
logo
 

ঘুরে এলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মালয়েশিয়া

কমল খানঃ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে স্বাধীন হয়েছে মালয়েশিয়া। মুসলিম দেশ হিসেবে অল্প সময়ে অনেকদূর এগিয়েছে দেশটি। আর এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচে বেশী অবদান যার তিনি হলেন দেশটির ২০ বছরের রাষ্ট্রনায়ক ড. মহাথির মোহাম্মদ। বর্তমানে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিলেও

তার দলই ক্ষমতায় রয়েছে। মহাথির মোহাম্মদের পরিকল্পনা অনুসারে মালয়েশিয়া এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। বিস্তির্ণ রাবার বাগান সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভূমি মালয়েশিয়া ঘুরে এলাম কদিন আগে। দেশটি ঘুরে মনে হয়েছে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে আরেকটি ইউরোপ  হচ্ছে মালয়েশিয়া। ইউরোপিয়ান ষ্টাইলেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। অর্থনীতি, যোগাযোগ, পর্যটন, বিদ্যুৎ, সবদিক দিয়েই সয়ং সম্পৃর্ণ একটি দেশ। ৯ দিনের সফরে কোথাও যানজট দেখিনি, এক সেকেন্ডের জন্যও বিদ্যুত যায়নি। আধুনিকতা দিন দিন উন্নতীর স্বর্ণশিখরে নিয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়াকে।
১১ জুন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস এর একটি বিমানে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ি। দূর্ভাগ্যবশত আমার সফর সঙ্গী একদিন আগেই চলে যায় সেখানে। তবে যাওয়ার সময় আমার এক বাল্যবন্ধু রুহুল আমীনের সঙ্গে স্বাক্ষাত হয়। সেও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে তবে ভিন্ন বিমানে। কিছুক্ষন ওর সাথে সময় কাটিয়ে ভালোই লেগেছে। রাত সোয়া ৯ টায় বিমান ছাড়ে। মাত্র ৪ ঘন্টায় গিয়ে পৌছে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে। ওখানকার সময় রাত সাড়ে তিনটা তখন। ইমিগ্রেশনস কাষ্টমস শেষে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে পা দিলাম মালয়েশিয়ার মাটিতে। মাটিতে পা ছোয়ানোর আগেই পড়তে হলো এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। এয়ারপোর্টের বাইরে বেরুনোর আগেই কালো পোশাকের একজন আমাকে ডাক দিলো। ভাবলাম কাষ্টমস এর লোক হবে। সামনে যেতেই ”টিকেট প্লীজ” বললো। আমি পাসপোর্ট টিকেট দুটোই তার সামনে তুলে ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজন এসে আমাকে ঘিরে ধরলো। এরমধ্যে নেতা টাইপের একজন বলে উঠলো তোমার হোটেল বুকিং কোথায়। আমি বললাম এখানে আমার আত্মীয় আছে ওর বাড়িতে উঠবো। ওরা কিছুতেই মানতে চাচ্ছিলোনা। একপর্যায়ে বলে উঠলো এটা বাংলাদেশ না মালয়েশিয়া। এখানে এদেশের নিয়মই চলবে। তখন ওরা আমার কাছে ২শ ইউএস ডলার দাবি করলো। আমি দরকষাকষি করে ১শ ইউএস ডলার দিলাম। ওরা আমাকে রিসিট দিয়ে প্রাইভেট কারে উঠতে বললো। আমি বিমানে বসেই শুনেছিলাম প্রাইভেট কারে উঠলেই ওরা গলাকাটা পয়সা নেয়। অনেক জোরাজুরি করেও ওরা আমাকে প্রাইভেট কারে তুলতে পারলোনা। একপর্যায়ে আমি বাসষ্ট্যান্ড কোথায় জানতে চাইলে ওরা আমাকে বাসষ্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে গেলো। পরে সফর সঙ্গী আজিজ ও অন্যান্যদের কাছে ঘটনাটি জানানোর পর ওরা বললো ওগুলো কাষ্টমস এর কেউ ছিলোনা, ওরা ছিলো প্রতারক গাড়ী চালক। ভূয়া রিসিট দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ডলার। তিক্ত এই অভিজ্ঞতা নিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করলাম সেখানকার সময় ভোর ৫টায়। অচেনা- অজানা শহর। এক বিয়াই আজিজের নাম্বার ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। সেখানে কয়েকজন বাঙ্গালী ছিলো, ওদের কাছে কোন মোবাইল ফোন ছিলোনা। পরে এক জাপানী নাগরিককে অনুরোধ করে তার মোবাইল ফোন থেকে বিয়াইকে ফোন দিলাম। ফোন রিসিভ করলো কথা হলো। তারপরও প্রায় এক ঘন্টা খোজাখুজির পর স্বাক্ষাত মিললো বেয়াইয়ের। অচেনা দেশে যেন প্রাণ ফিরে এলো। ঐদিন দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থেকে উঠলাম। বাইরে বেরিয়েই প্রথমে দেখা হলো সেলিমের সাথে। ওর বাড়ী বন্দর চৌধুরীবাড়ী। মালয়েশিয়ায় আছে ১৩ বছর। এখানে চায়না টাউন নামক এলাকায় সেন্টের দোকান সেলিমের। কথায় কথায় জানালো এই দোকান থেকেই মাসে এক থেকে দেড় লক্ষ টাকা আয় করে সেলিম। প্রবাসে ভালোই আছে। তবে দেশের কথা মনে হলে খারাপ লাগে। জীবীকার তাগিদে প্রবাস জীবন অচীরেই শেষ করে দেশে ফিরবে বলে জানায় সে। এরপর দেখা হয় মুকফুলদী এলাকার আঃ বাতেন এর সাথে। সে এখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। চায়না টাউন ও আশপাশে তার কয়েকটি দোকান। রয়েছে গার্মেন্টস আইটেমের ব্যাবসা। ভালই আছে। দেশে কবে যাবেন জানতে চাইলে বললেন ঠিক নেই। এখানেই তো ভালো আছি। দেশের পরিস্থিতি ভালো না। তাই দেশে যেতে মন চাইলেও আবার ভাবি এখানেইতো ভালো আছি।
ঘুরে এলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মালয়েশিয়াদেখা হয় সোহেল রানার সঙ্গে। সোহেল মালয়েশিয়ায় ব্যাবসা করে। পাশাপাশি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সোহেলের সঙ্গে দেশেই ভালো পরিচয় ছিলো। সোহেল জানালো ১৪ জুন মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের একটি সভা আছে। সভায় আমাকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলো। আমি রাজী হয়ে গেলাম। যথাসময়ে সভায় উপস্থিত হয়ে দেখলাম এ যেনো বাংলাদেশীদের মিলনমেলা। সেখানকার মামা শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়া আওয়ামীলীগের আহ্বায়কসহ অনেকে ছিলো। আমাকে সেখানে মঞ্চে ডেকে নিয়ে সংবর্ধনা দেয়া হলো। বক্তব্যে প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানালাম। এই অনুষ্ঠানকে মালয়েশিয়ায় মিনি বাংলাদেশ হিসেবে অখ্যায়িত করলাম। এতো বাংলাদেশীকে একসাথে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। প্রবাসী বাংলাদেশীদের কন্ঠের গান খুব ভালো লাগলো। বিদায় নেয়ার সময় আয়োজকরা রাতের ডিনার হাতে ধরিয়ে দিলো। পরদিন গেলাম মালয়েশিয়ার সবচে আকর্ষনীয় স্থান গ্যাসথিং হাইল্যান্ডে। কুয়ালামপুর থেকে ১ ঘন্টার পথ। সেখানে অসংখ্য কেবল কারের মধ্যে একটিতে উঠে উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। এর আগেও ইউরোপের সুইজারল্যান্ডে বরফের পাহারের চুড়ায় উঠতে ক্যাবল কার দেখেছি। সেখানে ক্যাবল কার ছিলো ২৫/৩০ টি আর এখানে প্রায় দুশ ক্যাবল কারে হাজার হাজার পর্যটক যাচ্ছে গ্যানথিং হাইল্যান্ডে। কয়েক হাজার ফুট উপরে পাহারের চুড়ায় এক আধুনিক শহর হলো গ্যানথিং হাইল্যান্ড। এখানে আলো আধারী আর কুয়াশায় ঢেকে যায় পুরো শহরটি। আবার মুহুর্তেই সুর্যের আলো চলে আসে। প্রবাসীরা বলে থাকে মালয়েশিয়ায় এসে গ্যানথিং হাইল্যান্ডে না এলে সফর অপূর্ণ থেকে যায় । এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে । গ্যানথিং হাইল্যান্ডে রয়েছে বিশ্বের সবচে বড় জুয়ারীদের আড্ডা। হাজার হাজার পুরুষ মহিলা পর্যটক এখানে এসে কোটি কোটি টাকার জুয়া খেলছে। এ যেন বিশাল এক জুয়ার মেলা। মালয়েশিয়ায় বুকেট বিনতান, আইটি সেন্টার, সবচে উচু বিল্ডিং টুইন চাওয়ার দেখে অভিভুত হয়েছি। মালয়েশিয়ার উন্নয়নে ড. মহাথির মোহাম্মদের নেতা যেমন রয়েছে তেমনি এখানকার মালাই ও চায়নাদের অক্লান্ত পরিশ্রম মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গেছে ইউরোপের কাছাকাছি।, কবে এগিয়ে যাবে প্রানপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪