Sun, 22 Jul, 2018
 
logo
 

৩০ বছর ধরে বিদ্যুতহীন পুরো একটি গ্রাম!

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুত দিতে পারবে সরকার। ৪৬৫টি উপজেলাকে শিগগিরই শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা হবে। এমন ঘোষনা খোদ প্রধান মন্ত্রীর। শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুত এর আওয়াতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুভ উদ্বোধন করেন দুই বছর আগেই। অথচ এই জেলারই সদর উপজেলার পুরো একটি গ্রামে এখনও সংযোগ পায়নি বিদ্যুতের। ৩০টি বছর বিদ্যুতহীন গ্রামের খবর নেয়নি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের কেউ!

এমন গ্রামের সংবাদ যখন লাইভ নারায়ণগঞ্জের কাছে আ‌সে, তখন এটি প্রতিনিধি দল ছুটে যায় সেখানে। প্রদীপের নিচে আন্ধকার, নগরের কোলঘেঁষা অসহায় গ্রামের জীবন চিত্র তুলে এনেছেন আমাদের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট গোলাম রাব্বি ও তার সহযোগীতায় ছিলেন- শারমিন, রাকিবুল, শফিউল, আমিনুল ও হাসিবুর । আজ তুলে ধরা হচ্ছে সেই গ্রামের বিদ্যুতহীন অন্ধকারের কষ্টের ফিরিস্তি-

নগর ভবন থেকে মাত্র ২(প্রায়) কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রামটির নাম ‘মধ্যচর’। সুবজ গাছ আর টিনের ঘর বিস্তৃত এই গ্রামটির পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে বুড়িগঙ্গা নদী। বর্ষা হলে দ্বীপে রূপ নেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে সাকো আর নৌযান।

এই গ্রামটিতেই নেই কোন বিদ্যুতের কোন সংযোগ। রাত হলেই ঘুটঘুটে আঁধার নেমে আসে গ্রামটিতে। তাই দিনের আলোই একমাত্র ভরসা মধ্যচরের শিক্ষার্থীদের। গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে ৮টা মানেই গভীর রাত। শিশু কিশোরদের গল্প গুজব আর কানা মাছি খেলার সময়।

শিল্পকারখানা অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জের আলিরটেক ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডে গ্রামটির অবস্থান। একটি সাকো পাড়ি দিলেই পাওয়া যায় শহরের সকল সুবিধা। বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাও। শুধু এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত মধ্যচরের ৫ শতাধীক মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদ বলছে, গ্রামটিতে ২১০ জন ভোটার রয়েছে।

আলিরটেক ইউনিয়নের গোগনগর এলাকাটি মহান মুক্তি যুদ্ধের কিছুদিন পরে নদী ভাঙ্গনে দু ভাগ হয়ে যায়। এর বেশ কিছু বছর পরে চর জেগে উঠে। দু ভাগের দুটি নাম পায়। এক পাড়ের নাম হয় পূর্ব গোগনগর আরেকটি হয় মধ্যচর। চর জাগার প্রায় ১০পরে শুরু হয় বসতি।

মধ্য চারে ৩০ বছর ধরে মানুষের বসবাস। কিন্তু সার্ভে করার সময় গোগনগর হিসেবে দেখানো হয় এ চরকে। ফলে সরকারি রেকর্ড মধ্যচর বলতে কোন গ্রাম নেই ইউনিয়নে। বিদ্যুৎ বিভাগও এ সুযোগে বিদ্যুৎ সবরাহে দেখাচ্ছে নানা অজুহাত । অথচ এই গ্রামের পাশেই রয়েছে একটি বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র।

মধ্যচরের প্রায় ২‘শ বাড়ি। অধিকাংশ বসবাসরতদের এক মাত্র ভরসা সৌর বিদ্যুৎ। তবে এর নিবু আলো মানুষিক সান্তনা ছাড়া আর কিছু নয়।

মধ্যচরবাসীদের কথা:

দীর্ঘ ১৫ বছর যাবত বিদ্যুৎ আনার চেষ্টা করছে গ্রামের বাসীন্দারা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলসহ সাংসদদের কাছ থেকেও আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পায়নি।

গ্রামটির একমাত্র মসজিদের ইমাম আব্দুর রব বলেন, মধ্যচরে বিদ্যুৎ না থাকায় আশপাশের এলাকার গুলো থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এখানকার মানুষ। চর উঠার প্রায় ৪০ বছর অতিবাহিত হলেও, এখনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়নি। ছেলে মেয়ে গুলোকে পড়ালেখা করতে হয় নদী পাড়ি দিয়ে।

মধ্যচরের ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মহিউদ্দিন ব্যাপারি জানান, বয়সটা তো শেষ করলাম বিদ্যুত ছাড়াই, কত বড় বড় নেতা আমাগো জেলায়, বড় বড় এমপি। কত জনে কত আশা দেহায়, বিদ্যুত কী দেইখা যেতে পারমু?

নগরের বাবুরাইল বউ বাজারের ৩৮ বছরের যুবক সবজি বিক্রেতা জিতু হোসেন জানালেন, শহর থেকে যখন রাতে গ্রামে ফিরি, প্রতি দিন ই আশায় থাকি কাইলই বুঝি লাইন বসবো (বিদ্যুতের খুঁটি)।

স্থানীয় মাতব্বর মজিবুর ভূঞার উদ্যোগে গত ২ বছর ধরে এলাকার অধিকাংশ বাড়ি থেকে টাকা তুলে বিদ্যুৎ অফিসে জমাও দেওয়া হয়েছে। মাতব্বর মজিবুর ভূঞা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে বিভিন্ন সময় আলাপ করলেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এলাকাবাসীর যে ক্ষোভ, ভোটের সময় বুজিয়ে দেবে।

ইউনিয়ন পরিষদের কথা:

আলিরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, আমি গিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিয়েছি, খুব দ্রুতই বিদ্যুতের খুঁটি আসবে।

অপরদিকে আলিরটেক ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. রানা আহমেদ রবি জানান, স্থানীয় মাতব্বর মজিবুর ভূঞাসহ বেশ কয়েকজনের সম্মেলিত উদ্যোগে মধ্যচরে বিদ্যুত নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। দীর্ঘ দিন যাবত শুনছি আজ দিবে, কাল দিবে। কিন্তু আসছে না।

জানা নেই ইউএনও’র:

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিলো না। এ কাজটি যেহেতু বিদ্যুৎ বিভাগের, আমি তাদেরকে জানাবো। এছাড়া যদি সম্ভব হয়, গিয়ে দেখে আসবো।

শহরের এতো কাছে অথচ যোজন যোজন দূরে যেন নাগরিক সুবিধা। শুধুই কী আশ্বাসে কাটাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মধ্যচরবাসী। রাজনীতির হিসেবে হয়ত দু তিন শ ভোট কিছুই না। মধ্যচরের ৫’শ মানুষ আর অন্ধকারে থাকতে চায় না। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের মহা সড়কে সংযুক্ত হতে চান তারাও। প্রত্যাশা করেন সাংসদ সেলিম ওসমান, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুত আসবে মধ্যচর গ্রামে।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম