Wed, 28 Jun, 2017
 
logo
 

‘আম্মু, বাবা আজকেও কবর থেকে উঠে আসেনি’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : আম্মু, বাবা আজকেও কবর থেকে উঠে আসেনি। আমাকে দশ টাকা দেয়নি, চকলেট দেয়নি। চলো বাবার কাছে যাই, বাবাকে নিয়ে আসি।

আমি বাবার কাছে যাবো বলে কান্না জুড়ে দেয় চর সৈয়দপুরে নৃশংস হত্যার শিকার জসিম চৌধুরীর ৫ বছরের শিশু সন্তান আহাদ।

মৃত্যু কি, কবর কি সে জানেনা। সে শুধুই জানে বাবা আসবে প্রতিদিনের মতো। রাতে চকলেটসহ বিভিন্ন মজাদার খাবার নিয়ে আসবে। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার হাতে দশ টাকার একটি নোট গুঁজে দিবে। সারাদিন সে মজা খাবে। বাবা আর কোনদিনও ফিরে আসবেনা এটা সে বুঝেনা। ছেলের অবুঝ আবদারের কাছে স্বামীহারা স্ত্রী ময়নাও আজ নির্বাক। সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলে দুরপ্রান্তে চেয়ে থাকে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চর গোগনগর এলাকার আহম্মদ চৌধুরীর ছেলে জসিমউদ্দিন চৌধুরী ৫ দিন নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চর সৈয়দপুর এলাকার ডাকাত সর্দারখ্যাত দৌলত হোসেন মেম্বারের মালিকানাধীন পরিবহন অফিস থেকে তার গলা কাটা লাশ উদ্ধার হয়।

মেট্টো সিমেন্টের লোড-আনলোডের কাজের নিয়ন্ত্রন ও জমি ব্যবসার অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনায় জসিমকে গলা কেটে হত্যা করা হয় বলে একাধিক সুত্র জানায়। এ ঘটনার পর থেকে এভাবে স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় নিহত জসিমের পরিবারটির। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষ ছিলেন তিনি।

অন্যদিকে বড় ছেলে আয়াত চৌধুরী (১৪) বর্তমান পরিস্থিতিতে স্তব্দ হয়ে গেছে। শুধু চেয়েই থাকে। সবাই যেন পরিবারটিকে স্বান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় আজো শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে জসিমের এলাকায়।

নিহত জসিমের বৃদ্ধা মা শাহিদা বেগম (৬২) ছেলের ছবি বুকে নিয়ে আর্তনাদ করছে। ফ্যাল ফ্যাল করে অশ্রু নয়নে সবার কাছে সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে মূর্ছা যাচ্ছেন। বিড়বিড় করে প্রলাপ করছেন আর বলছেন, ‘আমার ছেলেরে ফিরায়ে না দিতে পারলে ওগুরেও (খুনীদের) ওইভাবে মাইরা লা’। মায়ের কান্নায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। পাষানেরও বুক ফেটে কান্না আসে। স্তব্দ হয়ে উঠে চারিদিক। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে তিনিও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন।

সরজমিনে দেখা গেছে, নিহত জসিমের রয়েছে দুই ছেলে আয়াত চৌধুরী  (১৪) ও আহাদ চৌধুরী (৫) ও স্ত্রী ময়না বেগম (২৫)। জসিম পৈত্রিক ভিটে বাড়ির একাংশে একটি জরা জীর্ণ টিনশেড ঘরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতো। ঘরের ভেতর তেমন কোন আসবাবপত্র নেই। পুরোনো দুটি খাট, ভাঙ্গা আলনা ও আলমিরা ছাড়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য আসবাবপত্র নেই চোখে পড়ার মত। তার একমাত্র উপার্জনের উপর সংসার চলতো।

সংসারে অভাব-অনটন পিছু ছাড়েনা বলে মামা মুজিবুর রহমান ৫/৬ বছর আগে জসিমকে তার মেট্রো সিমেন্টের লোড-আনলোডের কাজটি দেখাশুনার দায়িত্ব দেয়। এরপর থেকে সংসারে ফিরে আসে স্বচ্ছলতা। কিন্তু বিধি বাম দুঃখ ও অভাবকে জয় করেত পারলেও রুখতে পারেনি শত্রুদের। খুনীদের ফাঁদা পাতে পা দিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে খুন হয় জসিম। এরপর থেকে পরিবারের চুলোয় পানি ফুটলেও ফুটেনি একমুঠো চাল। সাময়িকভাবে আত্মীয় স্বজনরা হাত বাড়ালেও তা ক্ষনস্থায়ী। দুই সন্তান নিয়ে জসিমের স্ত্রী ময়নার ভবিষ্যত কি তার সমাধান কেউ জানেনা। শিশু সন্তান নিয়ে দিশেহারা ময়না।

কথা হয় জসিমের বড় ভাই মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। জসিমের বড় ভাই অভিবাবক হিসেবে তিনি বলেন, তারা ৬ ভাইবোন। কেউই অর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। তারপরও সাময়িকভাবে সবাই মিলে জসিমের পরিবারকে সহায়তা করছেন। তবে ভবিষ্যতে কি করবেন এটার কোনো সুষ্ঠু সমাধান তিনি খোঁজে পাচ্ছেন না।

জসিমের স্ত্রী ময়নার দাবি হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি। এছাড়াও আর কোনো নারীর জীবনে যাতে এমন দুর্ভোগের ঘনঘটা নেমে না আসে। সন্তানের এমন করুণ মৃত্যুতে কোন মাকে যেন মূর্ছা যেতে না হয়। কোন সন্তানকে যেন তার বাবার নির্মম মৃত্যু আর নৃশংস ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখতে না হয়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রভাব মুক্ত থেকে নিরেপক্ষভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথার অনুরোধ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চর গোগনগর এলাকার আহম্মদ চৌধুরীর ছেলে জসিমউদ্দিন চৌধুরী ৫ দিন নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চর সৈয়দপুর এলাকার ডাকাত সর্দারখ্যাত দৌলত হোসেন মেম্বারের মালিকানাধীন পরিবহন অফিস থেকে তার গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।

এঘটনায় ওই দিন রাতেই নিহতের স্ত্রী ময়না বেগম বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৬ জনসহ মোট ১১ জনকে আসামী করে মামলা করে। আসামীরা হলো জেলা কৃষকলীগের সহসভাপতি ও সাবেক মেম্বার মো. দৌলত হোসেন (৫০) ও তার দুই ছেলে কাশেম (৩২), স¤্রাট (২৬), সাবেক মেম্বার আবুল হোসেনের ছেলে শাহপরান (২৫) ও মুন্সীগঞ্জ জেলার পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকার আব্বাস আলীর ছেলে মোশারফ হোসেন (৩২) সহ অজ্ঞাত আরো ৬ জন।

এছাড়া এ হত্যাকা-ের ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দৌলত মেম্বারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। নিহত জসিম উদ্দিন চৌধুরী মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকায় অবস্থিত মেট্রো সিমেন্ট কোম্পানীতে কর্মরত ছিলেন।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমিনুল হক নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক আমিনুল মামলায় উল্লেখিত আসামী না হলেও সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া মামলায় উল্লেখিত নামের অন্য কোন আসামী গ্রেপ্তার করতে পারেনি থানা পুলিশ।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪