Sun, 26 Feb, 2017
 
logo
 

জসিম হত্যা : ‘অধরা’ দৌলত, প্রভাবশালীদের ‘তৎপরতা’ শঙ্কিত পরিবার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : ১৫ দিন অতিবাহিত হতে চললেও চর সৈয়দপুরের জসিম হত্যা মামলার এজাহারভূক্ত কোন আসামীকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারে নি সদর থানা মডেল পুলিশ।

এ সুযোগে মামলাটিও ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে একটি পক্ষ। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।

এদিকে মামলার মূল আসামী ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা দৌলত মেম্বার সহ অন্যান্যরা এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন জসিমের স্ত্রী-পুত্র। কাল বিলম্ব না করে আসামীদের গ্রেপ্তার পূর্বক বিচারের আওয়াতায় আনার দাবী করেছে নিহতের পরিবার।

জসিম চৌধুরী হত্যাকা-ের ঘটনা কেন ঘটলো? কি ছিল এর নেপথ্য কারণ? তারই খোঁজ নিতে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাস্থল চর সৈয়দপুর। সরেজমিনে গিয়ে বিভন্ন জনের সাথে কথা বলে হত্যার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়াও হত্যাকা-ের পর ঘাতকরা চেয়েছিল লাশ ‘গুম’ করতে। কিন্তু, ঘটনার ৫ দিন পরও তাতে ব্যর্থ হয়েছিল নরঘাততের দল। সরেজমিনে গিয়ে এমন আরও অনেক তথ্যই তুলে এনেছেন ‘লাইভ নারায়ণগঞ্জ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আহমেদ শাওন।

যেভাবে দৌলত মেম্বারের সাথে পরিচয় হয়েছিল জসিমের
জসিম চৌধুরীর মামা ছিলেন মেট্রো সিমেন্টের ঠিকাদার ব্যবসায়ী মুজিবুর। তার সূত্র ধরেই দৌলত মেম্বারের সাথে জসিমের পরিচয়। এরপর থেকেই তাদের দুজনের মধ্যে বিভিন্ন সময় কথাবার্তাসহ একে অপরের কাজে সম্পৃক্ত হতে থাকে।

কে এই দৌলত মেম্বার?
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা তিনি। এছাড়া ডাকাত সর্দার হিসেবে তার ছিল পূর্ব খ্যাতি। ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজিসহ নানা স্থানীয় পর্যায়ে নানা অপকর্ম হতো তার নির্দেশে। এসব কাজ সম্পাদন করার জন্য তার ছিল একটি নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী।



ঘটনার সূত্র যেভাবে?
সন্ত্রাসী দৌলত মেম্বার তার মেয়ের জামাতার মাধ্যমে মুজিবুরের মেট্্েরা সিমেন্টের লোড-আনলোডের ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে পরিকল্পনা করে। কিন্তু জসিমের জন্য তা আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। তাই ভিন্ন কৌশলে দৌলত মেম্বার নিজের পথ থেকে জসিমকে সরাতে নিজের জমি কেনা-বেচার কাজে সম্পৃক্ত করে মুজিবুরের ব্যবসাটি দখল নেয়ার চেষ্টা চালায়।  

সূত্র বলছে, এরই মধ্যে জিসিমের কাছে থেকে নানা কৌশলে প্রায় কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে দুরন্ধর দৌলত মেম্বার। এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া জসিম নিজের টাকা ফেরত পেতে ‘চাপ’ দিতে থাকে দৌলত মেম্বারকে। এর জের ধরেই জসিমকে দৌলত ২৩ ডিসেম্বর বিকেলে তার অফিসে গলা কেটে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হত্যার পর লাশ গুম করার পরিকল্পনা থাকলেও ৫ দিনে তারা সে লাশ গুম করতে পারে নি।

যে কারণে লাশ গুম করতে পারেনি নর-ঘতকরা:
এলাকাবাসীর মতে যেখানে জসিমকে খুন করা হয় দৌলত হোসেনের মালিকাধীন স¤্রাট ট্রান্সপোর্ট ও ট্রেডার্সের দ্বিতীয় তলায় এর সামনেই একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে। ফলে এখানেই কয়েকদিন ধরে এর মেরামতের কাজ চলায় দিনভর লোকজনের উপস্থিতি ছিলো।

অন্যদিকে ঘটনাস্থলের উল্টো দিকের বাড়িতে কয়েকদিন ধরে জাকজমকপূর্ণভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিলো। ওই বাড়ির আলোকসজ্জ¦ায় স¤্রাট ট্রান্সপোর্টের সম্মুখসহ পুরো রাস্তাজুড়ে রাতভর আলোয় বিকশিত থাকতো। ফলে ঘাতকরা প্রকাশ্যে লাশ গুম করতে পারেনি। এরপরই এক প্রতিবন্ধির সহায়তায় জসিমের স্বজনরা তার গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশে খবর দেয়। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়।  এরপর থেকে একটি মহল  এ মামলাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানায়।

হত্যা মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেত অপরাধীদের শেল্টার দাতারা তৎপর :
মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে যারা অন্যতম তাদের মধ্যে রয়েছে দৌলতের স্ত্রী সমতাজ, চেয়ারম্যান নওশাদ ও মুসিগঞ্জ পঞ্চসাড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা। এদের মধ্যে সমতাজ দৌলতের সকল অপরাধ কর্মকান্ডের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকেন। দৌলতের অবর্তমানে সে পুরো অপরাধ জগতটা নিয়ন্ত্রন করে থাকে। এদের প্রত্যেকের সাথে নিয়মিত হত্যাকারিদের যোগাযোগ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানায়।

তথ্যমতে, এদের মধ্যে নওশাদ চেয়ারম্যানের সাথে দৌলত ও তার স্ত্রী সমতাজের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রয়েছে।

এছাড়া দৌলতের মেয়ে জামাতা মোশাররফ পঞ্চসার ইউনিয়নের মেম্বার। তার চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা তাদের রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন সূত্রে আরও জানা যায়, মামলা থেকে অভিযুক্তদের রক্ষা করতে মোটা অংকের রফাদফার চেষ্টাও করছে ওই মহল।

নিহত স্বজনদের চাওয়া ও পুলিশের আন্তরিকতা :
নিহত জসিমের বাড়িতে এখনো চলছে শোকের মাতম। থামেনি তার পরিবারের কান্না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন জসিম। তার সংসারে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। এরমধ্যে ৫ বছরের ছোট্ট শিশু আহাদ প্রতিদিনই ঘুমানোর আগে তার বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। বড় ছেলে আয়াত (১৪) বাবাকে হারিয়ে এখন নির্বাক প্রায়।

অন্যদিকে নিহত জসিমের স্ত্রী ময়না বেগম তার দুই ছেলেসহ আছেন নিরাপত্তাহীনতায়। তারা মামলা নিয়ে পুলিশের ভূমিকায় পুরোপুরি সন্তোষ হতে পারছেন না। তাদের মতে পুলিশ শতভাগ আন্তরিক হলে এতদিনে অন্তত একজন এজাহারভুক্ত আসামী গ্রেফতার সম্ভব হতো।  

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আজিজুল হক হাওলাদার যা বললেন :
মামলার তদন্ত ও আসামীদের গ্রেপ্তারে গুরুত্বসহকারে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। তাছাড়া তাদেরকে গ্রেফতারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১ জনকে আটক করা হলে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক খুনীদের সনাক্ত করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই খুনীদের গ্রেপ্তার সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিতের চেষ্টার বিষয়টি তিনি জানেননা বলে জানান, যেহেতু মূল আসামীদের সনাক্ত করা হয়েছে সেহেতু সকল অপচেষ্টাই বৃথা।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চর গোগনগর এলাকার আহম্মদ চৌধুরীর ছেলে জসিমউদ্দিন চৌধুরী ৫ দিন নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চর সৈয়দপুর এলাকার ডাকাত সর্দারখ্যাত দৌলত হোসেন মেম্বারের মালিকানাধীন পরিবহন অফিস থেকে তার গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।

এঘটনায় ওই দিন রাতেই নিহতের স্ত্রী ময়না বেগম বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৬ জনসহ মোট ১১ জনকে আসামী করে মামলা করে। আসামীরা হলো জেলা কৃষকলীগের সহসভাপতি ও সাবেক মেম্বার মো. দৌলত হোসেন (৫০) ও তার দুই ছেলে কাশেম (৩২), স¤্রাট (২৬), সাবেক মেম্বার আবুল হোসেনের ছেলে শাহপরান (২৫) ও মুন্সীগঞ্জ জেলার পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকার আব্বাস আলীর ছেলে মোশারফ হোসেন (৩২) সহ অজ্ঞাত আরো ৬ জন।

এছাড়া এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দৌলত মেম্বারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। নিহত জসিম উদ্দিন চৌধুরী মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকায় অবস্থিত মেট্রো সিমেন্ট কোম্পানীতে কর্মরত ছিলেন।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমিনুল হক নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক আমিনুল মামলায় উল্লেখিত আসামী না হলেও সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া মামলায় উল্লেখিত নামের অন্য কোন আসামী গ্রেপ্তার করতে পারেনি থানা পুলিশ।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪