Tue, 17 Oct, 2017
 
logo
 

চানমারি বস্তির বিকল্প ফাজিলপুর, হাত বাড়ালেই মিলছে ‘ইয়াবা’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : কারো কাছে বাবা, কেউ বলেন গুটি, কারো কাছে গোলাপী নামেই পরিচিত। তবে, যে যা নামেই ডাকুক না কেন মূলত এর নাম ‘ইয়াবা’। এই ইয়াবার জোয়ারে এখন ভাসছে ফতুল্লা থানার অত্যন্ত কাছের এলাকা হিসেবে পরিচিত ফাজিলপুর।


ফাজিলপুরে ‘ইয়াবা’ এতোটাই সহজলভ্য যে, যত্রতত্র হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রিও হচ্ছে প্রকাশ্যে। এসব দেখেও যেনো নিশ্চুপ প্রশাসন। মাদক নির্মূলে কার্যকরী কোন উদ্যোগ নিচ্ছেনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও।

তবে, মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রে প্রশাসন বলছে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা। স্থানীয়রা সচেতন হলে মাদক নির্মূল করাটা সহজ। আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবী, মাদক নির্মূলে প্রশাসনের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে অল্প সময়ের মধ্যেই মাদক নির্মূল করা সম্ভব।

এই মরণনেশা ইয়াবার ছোবলে ফাজিলপুর গ্রামের যুব সমাজ এখন ধ্বংস প্রায়। পথে বসতে শুরু করেছে অসংখ্য মাদক সেবীর পরিবার। আর ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা রাতারাতিই আঙ্গুল ফুলে হচ্ছে কলাগাছ। ফাজিলপুর পঞ্চায়েত কমিটি থাকলেও তাদের কার্যক্রমও যেন ঠুটোজগ্নাথ। ফলে হু হু করেই এখানে বাড়ছে মাদকের বিস্তার।

ফতুল্লার অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতা সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর জন্মস্থান এই ফাজিলপুর। এখানে রয়েছে তার পৈত্রিক বাড়ি। এখানকার অনেক ভালো-মন্দ অনেক কিছুরই সমাধান করেন তিনি। অথচ তার এলাকাতেই মাদকের বিস্তার! আর তা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না।

কারো কারো মতে, মোহাম্মদ আলী পদক্ষেপ নিলে ফাজিলপুর থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। কিন্তু, তিনি এ ব্যাপারে কোন রকম কার্যকরী পদক্ষেপও নিচ্ছেন না! এমনকি এনায়েত নগর ইউনিয়ণ পরিষদ চেয়ারম্যান বা নির্বাচিত মেম্বাররাও এসব ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। মাদক নির্মূলে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেই জোড়ালো কোন তৎপরতা। আর এ সুযোগেই লাগামছাড়া এখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা।  

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কখনো কখনো অভিযান চালিয়ে দু’ একজনকে আটক করলেও এরা জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়াও থানা পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের আর্থিক সু-সম্পর্ক থাকায় অনেক মাদক ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে মাদক বেচা-কেনা করে যাচ্ছেন।

স্থানীয় একাধীক সূত্র জানায়, ফাজিলপুর গ্রামে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি আলাদা আলাদা গ্রুপ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। এই গ্রুপে পুরুষ ও নারী রয়েছেন। আছে স্বস্ত্রীক কারবারিও। কোথাও কোথাও স্বামী হেঁটে হেঁটে মাদক বিক্রি করেন আর স্ত্রীরা ঘরে বসে। আবার মাদক আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের স্ত্রীকেই নিরাপদ মনে করে তাদের শরীরে মাদক বহন করিয়ে থাকে ব্যবসায়ীরা।

সূত্র জানায়, ফাজিলপুরে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে সর্ব-প্রথম শোনা যায় পুলিশের সোর্স শাওন হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ফরহাদের নাম। বর্তমানে সে অস্ত্র মামলায় জেলা কারাগারে বন্দী আছে। এরপরই শোনা যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আলীর ভাতিজা মাদক ব্যবসায়ী সাইদুলের নাম। বর্তমানে সে এখান থেকে খুচরা ও পাইকারীভাবে ইয়াবা সরবরাহ করে থাকে।

এছাড়াও রয়েছে মাদক ব্যবসায়ী কাকন। সে স্বস্ত্রীক এই ব্যবসার সাথে জড়িত। ইতোমধ্যে বেশ ক’বার মাদকসহ সে ও তার স্ত্রী পুতুল আটক হয়েছিলো। তবে, আইনের ফাঁক গলে আবারও তারা বের হয়ে এসে যুক্ত হয়েছে এই ব্যবসার সাথে।

শুধু কাকন বা তার স্ত্রী-ই নয়, তার বড় শ্যালিকা রুনি, ছোট শ্যালকী রত্না এবং তাদের স্বামী মাসুদ ও সুমনও রয়েছে এই ব্যবসার সাথে জড়িত। এর পাশাপাশি কাকনের ছোট ভাই রানাও ইয়াবা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে।

এরমধ্যে কাকন ও তার ছোট ভাই মোটর বাইকে করে ইয়াবা আনা-নেওয়াসহ বিক্রি করে থাকে। পাশাপাশি এরা মাদক বিক্রির কাজে ব্যবহার করছে কোমলমতি শিশু ও কিশোরদেরও। এছাড়াও মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত আছে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর মেয়ে সোনিয়া তার মেয়ের জামাতা রাসেল। রয়েছে সুরির মেয়ে হিসেবে পরিচিত রাণী ও তার স্বামী। এছাড়াও রয়েছে পোকার ছেলেখ্যাত মো. আলী, শামীম ও শওকত আলী।  

এদিকে মাদক ব্যবসায়ীদের এমন আস্ফালনের কারণে এলাকাবাসী প্রায় অসহায়। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে এখানকার শিশু কিশোররাও জড়িয়ে যাচ্ছে মাদক সেবন ও বিক্রিতে। এই এলাকায় মাদকের বিস্তার এতোটাই ভয়াবহতা যে, অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আছেন।

এছাড়া বহু ভালো ভালো পরিবারের সন্তানও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় তারা জড়িয়ে যাচ্ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের সাথে। পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতায় পুরো এলাকাজুড়েই বৃদ্ধি পেয়েছে নানা ধরণের অপরাধ প্রবণতা। অনেকের কাছে সন্ত্রাস ও মাদকের স্বর্গরাজ্যখ্যাত চানমারি বস্তির বিকল্প এলাকা হয়ে উঠেছে এই ফাজিলপুর।

এ ব্যাপারে জানতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাথে যোগোযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে, সাবেক সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোহাম্মদ আলী বলেন, শুধু ফাজিলপুর নয়, সারা জেলাতেই মাদকের আগ্রাসনে যুব সমাজ আজ ধ্বংসের পথে।

মাদক নির্মূলে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দাবী করে বলেন, প্রশাসন চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা যদি লাগে আমরা অবশ্যই তা করবো।

এব্যাপারে জানতে চাইলে ফতুল্লা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল উদ্দীন মাদকের ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে বলেন, মাদক নির্মূলে আমাদের অভিযান অব্যহত আছে। তবে, পরিবার ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না গেলে মাদক নির্মূল করাটা কষ্ট সাধ্য। এজন্য পরিবারসহ সামাজিক আন্দোলনটা জরুরী।

তিনি থানার আলীগঞ্জ এলাকার উদাহরণ টেনে বলেন, এখানকার মানুষ মাদক নির্মূলে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছে। যার জন্য এ অঞ্চলটিকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা বার বার ছাড়া পেলেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যহত রাখি। মাদক নির্মূলে প্রশাসন সবসময় জিরো টলারেন্স।

তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধসহ সাধারণ মানুষের ভূমিকা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দাবী করে বলেন, জনগণের সাহায্যে নিয়েই আমরা সফল হচ্ছি। ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষকে আমার নাম্বার দিয়ে বলেছি মাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে দশ মিনিটের মধ্যেই আমি এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম