Sat, 21 Oct, 2017
 
logo
 

চাষাড়ার ‘জিয়া হল’ এখন যেন ভূতের বাড়ি, নেই সংস্কারের উদ্যোগ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : সংস্কৃতিকর্মী, নাট্যশিল্পীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের পদচারণায় মুখোরিত ছিল চাষাড়ায় অবস্থিত শহীদ জিয়া হল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নগরীর একমাত্র এই থিয়েটার হলটি সংস্কারের অভাবে এখন যেন ভূতের বাড়িতে রূপান্তর হয়েছে।

রাজনৈতিক পালাবদল আর হিংসাপরায়ণ মন-মানসিকতার বৌদলতে এই থিয়েটার হলটি সংস্কারে নেয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ। ফলে সংস্কৃতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে নগরবাসী।

শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাড়া রাইফেলস ক্লাবের পূর্বপার্শ্বের একটি পুকুর ভরাট করে ৫৯ শতাংশ জায়গার উপর নির্মাণ করা হয় একটি থিয়েটার হল। যা শুরুতে নামকরণ ছিল টাউন হল। পরবর্তীতে নামকরণ হয় জিয়া হল। এরপর থেকেই নানা ধরণের অনুষ্ঠানে জমজমাট থাকতো জিয়া হলের অডিটরিয়াম। কালের বিবর্তনে জিয়া হল অডিটরিয়াম পড়ে আছে জরার্জীন অবস্থায়। একসময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিকমনা ব্যক্তিদের মিলন মেলা ছিল এই জিয়া হলকে ঘিরে। নারায়ণগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমীর নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে শহরের মানুষের কর্মব্যস্ততার মধ্যে একটু বিনোদনের সুখ পেতে ছুটে আসতেন এখানে।
চাষাড়ার ‘জিয়া হল’ এখন যেন ভূতের বাড়ি, নেই সংস্কারের উদ্যোগ
বিগত জোট সরকারের শেষ সময় থেকেই জিয়া হলের অডিটরিয়ামে বৃষ্টির পানিতে ভেসে যেত। তৎকালিন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক হারুনর রশিদ এটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তবে, এর আগেই তিনি বদলী হয়ে যান। সেই সাথে ক্ষমতার পালাবদলও হয়। যার ফলে জিয়া হলের জীর্ণদশা।

বর্তমান সরকার আমলেও এটি সংস্কারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। অনেকের অভিযোগ, জিয়া হল নাম হওয়ার কারণেই বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্টরা এটি সংস্কারের এগিয়ে আসছে না। যদিও মহাজোট ক্ষমতায় আসার শুরু দিকে তৎকালিন সাংসদ নাসিম ওসমান জিয়া হলের নাম পরিবর্তন করে এটি সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেলেন। কিন্তু, বিএনপি নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থানের কারণে নাম পরিবর্তন আর সম্ভব হয়ে উঠে নি। ফলে সংস্কার কাজেও আর হাত দেয়া হয় নি।
চাষাড়ার ‘জিয়া হল’ এখন যেন ভূতের বাড়ি, নেই সংস্কারের উদ্যোগ
এদিকে জিয়া হল অডিটোরিয়ামটি মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় অনেক দিন যাবৎ ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে, হলের আউটডোরে বিভিন্ন সময় নানা সংগঠনের নামে মেলা কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়।

নানা সময়ে এ হলকে জিয়া হল, মুক্তিযোদ্ধা হল, টাউন হল নামে সম্বোধন করা হয়েছে। যে নামেই ডাকা হোক না কেন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই হলের সংস্কারকাজ বর্তমানের সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্টদের অনিহার কারণেই থমকে আছে।

এ ব্যাপারে সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, জিয়া হল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনে, তারাই এ হলের ব্যাপারে সকল সিদ্ধান্ত নেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে যদি এ হলকে  সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়নে দেওয়া হয় তবে এর সংস্কার দ্রুত হবে। সংস্কার না হলেও এর আউটডোরে অনেক মেলা বানিজ্য দেখতে পেয়েছি যা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের মনে কষ্ট দিয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, খুব দ্রুত  এ হলের সংস্কারকাজ শুরু করা হোক।

নারায়ণগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিসুল হক সানি বলেন, শহীদ জিয়া হল নামকরণ হওয়ার কারণেই মূলত এ হলের সংস্কার হয়নি। তাছাড়া এখন শিল্পকলা একাডেমী নগরবাসীর শিল্প চর্চার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করছে। শুধু জিয়া হল নয়, সে সাথে আলী আহমদ চুনকা পাঠাগারের কাজ ও ধীর গতিতে হচ্ছে। নগরের মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের জন্যে এ  হলের সংস্কার অতি জরুরি।

প্রসঙ্গত, নানা সময়ে এ হলের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও তা কথাতেই থেকে গেছে। এ হলের সংস্কারকাজ কিভাবে কথাতেই সীমাবদ্ধ ছিল তা বোঝার জন্য ১৯৬৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের গৃহিত পদক্ষেপ দেখলেই বোঝা যায়। সাম্প্রতিককাল থেকে ১৯৬৩ সালে এই হলকে ঘিরে নেওয়া সিদ্বান্তগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে।

২০১৫ সালের ৬মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক  আনিসুর রহমান মিঞার সভাপতিত্বে এক অনুষ্ঠানে হলটি ভেঙ্গে একসময় বহুতল ভবন তৈরীর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিলো নারায়ণগঞ্জবাসীর বিনোদন, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য চর্চা ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্র বাড়িয়ে তুলতে দ্রুত টেন্ডারের মাধ্যমে শহীদ জিয়া হলের জরাজীর্ণ ভবন ভেঙ্গে  সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ  করা হবে। যেখানে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি শিল্পকলা, শিশুদের মেধা বিকাশ, সঙ্গিত, নৃত্যসহ অন্যান্য বিষয়ের চর্চা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য অডিটোরিয়ামের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুবিধাসমৃদ্ধ একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ানুসারে অচিরেই জিয়া হলের জরাজীর্ণ ভবন টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়ে ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার পর সয়েলটেস্ট করা হবে। পরবর্তীতে দ্রুত গতিতে বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হবে। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান।

২০১৪ সালের মার্চে এক অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান বলেছেন, চাষাড়ার শহীদ জিয়া হলটির প্রকৃত নাম ‘নারায়ণগঞ্জ টাউন হল’। এ হলটি ভেঙে বহুতল ভবন করে বিভিন্ন বিনোদন, সাংস্কৃতিককেন্দ্র ও মিলনায়তন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

২০১০ সালের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়ায় অবস্থিত ‘শহীদ জিয়া হল’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘টাউন হল’ নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।  জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১৬তারিখে ১ম যুগ্ম জেলা জজ মোঃ আবু মোহসিন তারিখে এক রায়ে উক্ত সম্পত্তি জিয়া হলের অনুকূলে রায় প্রদান করলে সরকার উক্ত সম্পত্তি জিয়া হলের নামে নামজারী করে। আইন শুদ্ধভাবে জিয়া হলের নিজস্ব ভূমিতেই জিয়া হল প্রতিষ্ঠিত।

২০০৪ ইং সনে সংশ্লিষ্ট কমিটি জিয়া হলের নামে নামজারীর উদ্দ্যেগ নিলে দেখা যায় যে- উক্ত সম্পত্তি ভেস্টেড অ্যান্ড নন-রেসিডেন্ট প্রোপাটি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকার পক্ষে তৎকালিন নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষে লিপিবদ্ধ থাকায় জেলা প্রশাসক নেতৃত্বধীন জিয়া হল পরিচালনা পরিষদ সরকারের বিরুদ্ধে যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত মোকদ্দমা দায়ের করলে সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নারায়ণগঞ্জ উক্ত মোকদ্দমায় কনটেস্ট করে।

১৯৯৬ ইং সালে শহীদ জিয়া হলের সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধা হল নামকরণ করা হয়। শহীদ জিয়া হলটির ব্যবস্থাপনা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি দ্বারা পরিচালিত।

১৯৭৮ ইং সনে জেনারেল জিয়া নারায়ণগঞ্জের আসলে দলমত নির্বিশেষে শহরের তৎকালিন মুরব্বীদের দাবীর মূখে শহর ও শহরতলীর উন্নয়নের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারকে চেয়ারম্যান করে নারায়ণগঞ্জ শহর উন্নয়ন কমিটি গঠন করে প্রাথমিকভাবে এক কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেন। উক্ত কমিটি সংক্ষেপে এনটিডিসি নামের পরিচালিত ছিল। অডিটরিয়ামটির নির্মাণের অর্থের মূল যোগানদাতা ছিল এনটিডিসি।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এনটিডিসি সর্বসম্মতিক্রমে অডিটরিয়ামটি শহীদ জিয়া হল  নাম করণ করা হয়। সে থেকেই জিয়া হল নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত। তৎকালিন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার জিয়া হল আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করেন।

সি.এস রেকর্ড জরিপে উক্ত সম্পত্তির মালিক ছিল ব্রজেন্দ্র রায় চৌধুরী ও দেবেন্দ্র চৌধুরী এবং তাদের ওয়ারিশ সন্তোষ কুমার রায় চৌধুরী।

১৯৬৩ সালে মাত্র ১৫ হাজার টাকায় তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এসএ সাত্তারের নিকট বিক্রয় করেন। টাউন হল তথা একটি অডিটরিয়াম নির্মাণের উদ্দেশ্যে শহরের তৎকালিন মুরুব্বীদের আখাংকা পূরণের সার্থে মহকুমা প্রশাসকের মাধ্যমে নগদ মূল্যে উক্ত জমি ক্রয় করা হয়।

তবে এতো কিছুর দিকে না তাকিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসী চায় জিয়া হলের সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিকায়ন। যেখানে তারা কর্মব্যস্ততার মাঝে বিনোদনের ছোঁয়া পাবে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গরা পাবে সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার জায়গা। বিভিন্ন সময় নেওয়া উদ্যেগগুলো বাস্তবায়ন করলেই শহরবাসীর এ প্রত্যাশা পূরণ হবে।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম