Mon, 26 Jun, 2017
 
logo
 

আপন কর্মে মহিয়ান আইভী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : বাংলাদেশের সবগুলো সিটি করপোরেশনের মধ্যে একমাত্র ও প্রথম নারী মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে পুরো দেশবাসীর কাছেই আজ অতি পরিচিত নাম ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।

কারো কারো কাছে তিনি অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। প্রতিবাদ কী করে করতে হয়ে, তা অনেকে তাকে দেখেই শিখছেন।

দলগতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পৈত্রিকসূত্রেই জড়িত। এখনও আছেন এই দলে। তারপরও দলমত নির্বিশেষে আপমর জনতার সাথে তার রয়েছে অত্যন্ত বন্ধুত্ব সুলভ সম্পর্ক। কখনোই তিনি নিজেকে দলীয় প্রভাবে আবৃত করেন নি। ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গেই দীর্ঘ ১৩ বছর ধরেই নগরবাসীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন নগরবাসীর কাছ থেকে অমুল্য ভালোবাসা।

তার শুরুটা হয়েছিলো সেই ২০০৩ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন দিয়ে। রাজনীতির মাঠে একেবারে আনকোড়া হলেও প্রথম নির্বাচনেই বাজিমাৎ করে তিনি চিনিয়েছিলেন তার জাত। এরপর নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর পৌরসভাকে একভূত করে গঠন করা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবাররের সন্তান অবিজ্ঞ রাজনৈতিক শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। সেই সাথে বাংলাদেশের মধ্যে ‘প্রথম নারী’ মেয়র হিসেবে ইতিহাসে নিজের নামটি তুলে নেন তিনি।

পৌরসভার ৮ বছর ও সিটি করপরোশেনের ৫ বছর মিলিয়ে মোট ১৩ বছর ধরেই তিনি নগরবাসীর সুখে দু:খে নিজেকে সম্পৃক্ত করে রেখেছেন। করেছেন নানামুখী উন্নয়ণও। যার ফলে এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মানুষ তাকেই বেছে নিয়েছেন। অনেকের মতে, দলমত নির্বিশেষে সতন্ত্র সত্বার জনপ্রতিনিধি আইভী।

জন্ম : সেলিনা হায়াৎ আইভী ১৯৬৬ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহণ করেন।

পরিচিতি ঃ সারাদেশের মানুষ সেলিনা হায়াৎ আইভীকে চেয়ারম্যান এবং এখন মেয়র হিসেবে জানলেও নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে তার প্রথম পরিচয় আলী আহমেদ চুনকার মেয়ে। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান চুনকা আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। বাণিজ্যিক শহর নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও ¯েœহধন্য ছিলেন।

শিক্ষাজীবন: । ১৯৯২ সালে রাশিয়ার ওডেসা পিগারভ মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি) ডিগ্রি নেওয়ার পর মিডফোর্ড হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করার সময় ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৯৪ সাল থেকে এক বছর নারায়ণগঞ্জের ২০০ শয্যা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পর উচ্চতর পড়াশোনা করতে তিনি চলে যান নিউজিল্যান্ডে।

সংসারজীবন: সেলিনা হায়াৎ আইভী কাজী আহসান হায়াৎ এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আইভী দুই সন্তানের জননী। নারায়ণগঞ্জের সক্রিয় রাজনীতিতে আইভী দেশে ফিরলেও তার স্বামী এবং দুই সন্তান নিউজেল্যান্ডে অবস্থান করেন।

রাজনীতিতে পদাপর্ণ : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে যখন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুর্দিন চলছিল, তখন নারায়ণগঞ্জে দলের হাল ধরেছিলেন আইভী। পেশাগত অবস্থানের বলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ নারায়ণগঞ্জ শাখার আহ্বায়কও হন তিনি। ২০০২ সালে ফিরে আসার পরই নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় হন রাজনীতিতে। শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আর এরই মাঝে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করে নিতে সক্ষম হন। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সারা দেশের মানুষের কাছে লাইম লাইটে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। আর ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পৌরসভার মেয়র : চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়ে প্রবাস থেকে ফেরার পর ২০০৩ সালে আইভী যখন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাচনে প্রার্থী হন, তখন চুনকার মেয়ে হিসেবেই তাকে বিজয়ী করেছিলেন নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা। টানা আট বছর তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রথম নারায়ণগঞ্জ  সিটি কর্পোরেশন মেয়র : পৌরসভা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় অনেক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট এ কে এম শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটে হারিয়ে বাংলাদেশের কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন আইভী। তারপর থেকে ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার বিরোধ চরমে ওঠে। তবে এই দ্বন্দ্ব পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবেই পেয়েছেন তারা।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা ওসমানদের বিরোধী শিবির থেকেই স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন আইভীর বাবা চুনকা। প্রথমবারের এনসিসি নির্বাচনের পর ত্বকী হত্যাকান্ড এবং সাত খুন নিয়ে আইভী ও শামীম ওসমানকে প্রকাশ্যে সভায় একে অন্যের বিষোদগারের পাশাপাশি টেলিভিশন বিতর্কে মারমুখী হয়ে উঠতেও দেখা যায়।

মেয়র থাকাকালীন তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মধ্যে থাকা সাতাশটি ওয়ার্ডের উন্নয়ণ করে নগরীর চেহারা বদলে দিয়েছেন। একই সাথে মানুষের দোঁরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র : প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়া নাসিক নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানকে আশি হাজারের মতো ভোটে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এর অভিভাবক হিসেব নির্বাচিত হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সদ্য সমাপ্ত এ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের  আগে আইভী আবার প্রার্থী হতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ তা আটকাতে চেয়েছিল। মহাননগর আওয়ামী লীগ থেকে আনোয়ার হোসেনসহ তিনজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে পাঠানো হয়েছিল কেন্দ্রে।

এই আনোয়ার হোসেন গতবার আইভীর নির্বাচনের প্রথম সমন্বয়ক ছিলেন। নিজের জেলায় দলের মধ্যে বিরোধিতায়ও হাল ছাড়েননি আইভী। আইন সংশোধনের পর দলীয় প্রতীকের এই নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে আইভীকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। সে সাথে সাংসদ শামীম ওসমানকেও কঠোরভাবে সতর্ক করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে শামীম সংবাদ সম্মেলন করে আইভিকে ছোট বোন আখ্যায়িত করে তার প্রতি সমর্থন জানান। তবে নির্বাচনী বিধির কারণে প্রচারে নামার সুযোগ ছিল না এই সাংসদের।

আওয়ামীলীগের কেন্দ্র থেকে সিদ্বান্ত যে কতোটা যোক্তিক ছিল তা নির্বাচনের পরে  সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়ের মাধ্যমে তা সকলের কাছে প্রমানিত হয়।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪