Mon, 18 Dec, 2017
 
logo
 

না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : অপরিকল্পিত নগারয়ণের কারণে একটু বৃষ্টি হলেই শহরময় হয়ে উঠে রবী ঠাকুরের ‘ছোট নদী’। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি নিষ্কাশনের পথও প্রায় রুদ্ধ।

শহর ও শহরতলীর প্রায় সব ক’টি খালই দখল কের রেখেছে ক্ষমতাসীনরা। রাজউকে প্লান পাশ করা নিয়েও ভোগান্তি কম নয়। আবাসিক এলাকার ভেতরই শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে। তবে, মেয়র ও জেলা প্রশাসকের আন্তরিকতায় সুন্দর একটি নগরায়ণ ও স্বচ্ছ নারায়ণগঞ্জ গড়া সম্ভব বলেই মনে করেন নারায়ণগঞ্জবাসী।
না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন
দেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম জেলা নারায়ণগঞ্জ। ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা ও শিল্প নগরী হওয়াতে রোজগারের আশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই শত শত মানুষ আসে এ জেলাতে। পঞ্চম আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করেন ৪হাজার ৩’শ ৮জন। ফলে আয়তনের তুলনায় দেশের দ্বিতীয় ঘনবসতিপূর্ণ জেলা হওয়ায় ধীরে ধীরে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে অনেক বসত বাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

জেলায় স্থাপনা নির্মাণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় ঘনবসতির পাশাপাশি গড়ে উঠছে বড় বড় শিল্পকারখানা। আবার শিল্প কারখানার জন্য নির্ধারিত স্থানে ঠাঁই পাচ্ছে বসতবাড়ি। শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নির্গমনসহ নানা ধরণের ময়লা ফেলা হচ্ছে জনবসতিপূর্ণ স্থানে। রাস্তা, ড্রেন নির্মাণেও রয়েছে নানা অভিযোগ। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অভাব ও নানা অনিয়মের কারণে নারায়ণগঞ্জ ধীরে ধীরে অপরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে এগোচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ বহু বছর আগে থেকেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে বলে লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাড. এ বি সিদ্ধিক।

তিনি বলেন, ঢাকার চাইতেও বেশি এ জেলাতে সঙ্কট দেখা দিয়েছে চওড়া রাস্তা, ড্রেন, মাঠ ও গাছের। তেমনিভাবে শহরের টানবাজার এলাকার অলঙ্কার প্লাজার (সাবেক হংস হল) দক্ষিণ পাশের খালটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পথে। আর সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা করে ছিলো। কিন্তু, আমাদের আন্দোলনের মুখে পরে আর সম্ভব হয়নি। শুধু অলঙ্কার প্লাজার পাশের খালটিই নয়, একই অবস্থা জেলার খাঁনপুর, গলাচিপা, বাবুরাইলসহ আরো বেশ কিছু খালেরই এখন অস্তিত্ব বিলিন।

না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন
টাকা দিলেই মেলে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি
বঙ্গবন্ধু সড়কের বহুতল ভবনের এক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভবন নির্মণের আগে অনুমতি আনতে গেলে প্লানে একটু ত্রুটি ধারা পরে। পরে বেশ কিছু টাকা দিয়ে অনুমতি নেয়া হয়।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সড়ক, বিবি রোডসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মালিকরা বাড়তি টাকার বিনিময়ে প্লান পাশ করিয়ে এরকম একাধিক ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণ করেছেন।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ শহরের অনেক হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের নির্মাতা প্রকৌশলি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন লাইভ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, জেলার প্রায় ৬০ভাগ ভবনই অপরিকল্পিত। কারণ, এনসিসি’র কাছে একটি ভবনের প্লানের জন্য যোগাযোগ করলে তাদের ১বছরের অধিক সময় নষ্ট হয়। আর সেই প্লান পাশের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিয়মে লাগে ৪৫ দিন। ফলে নির্মাণের জন্য মালিক পক্ষ যে সময় নির্ধারণ করেন তা অতিক্রম হয়ে যাওয়াতে প্লান ছাড়াই ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করে দেয়। এনসিসি’র পক্ষ থেকে স্থাপনা নির্মাণের কোন তদরকী না থাকায়, প্রতিনিয়তয় জেলাতে গড়ে উঠছে প্লান বিহীন হাজারও ভবন। তাই সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি রাজউকেরও কার্যালয় এ জেলাতে অতি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন
জনবহুল এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান আর প্রতিষ্ঠানের স্থানে বসত বাড়ি
জেলার আবাসিক এলাকা, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সাথেই গড়ে উঠেছে শিল্প প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও ফতুল্লায় অবস্থিত শিল্প নগরিতে (বিসিক) শিল্পকারখানার জন্য নির্ধারীত স্থানেও ঠাই পেয়েছে বসতবাড়ি। এতে করে জেলার পরিবেশ ও মানুষ মারত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

পানি নিষ্কাশনের নেই সুব্যবস্থা
ডিএনডি থেকে সুষ্ঠুভাবে সেচ কার্য পরিচালনা করার জন্য ২’শ ২৫টিরও বেশি খাল রয়েছে। যার মধ্যে নিষ্কাশন করার জন্য ৯টি সেচ, ৯টি ডিটিও, ২’শ ১০টি আউট লেক, ৮৫টি চকবন্দী অনুসারে ১০টি নিষ্কাশন খাল রয়েছে। এ ছাড়াও এক কিলোমিটার দীর্ঘ ইনটেক খাল, ১৩কিলোমিটার দীর্ঘ মেইন ক্যানেল টার্ন আউট খাল রয়েছে। এর মধ্যে চ্যানেল-১ খালের র্দৈঘ্য ৭দশমিক ৯০ কিলোমিটার, চ্যানেল-২ এর দৈর্ঘ্য ৫দশমিক ৮০কিলোমিটার, পাগলা খাল ৩ কিলোমিটার, জালকুড়ি খাল ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার, শ্যামপুর খাল ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, ফতুল্লা খাল ১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ও সেকেন্ডারী চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ১০কিলোমিটার। এসব খালগুলোর অধিকাংশই রয়েছে প্রভাবশালিদের দখলে। ফলে নারায়ণগঞ্জ জেলাতে প্রতিবছর সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতায় মৃত্যুসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ডিএনডিবাসীকে।
না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন
বর্জ্য পরিশোধন:
ফতুল্লা খাঁন সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনের স্থানে ময়লা ফেলাকে কেন্দ্র করে গত জানুয়ারী মাসে চলছিলো নানা ধরনের ঘটনা। আশপাশের ইউনিয়নবাসী ও  এনসিসি’র বর্জ্যও সেখানে ফেলা হতো। যার কারণে ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারী পরিবেশ অধিদপ্তর এনসিসিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে। এরপর থেকে সিটি করপোরেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করেছে। কিন্তু তার পর থেকে এনসিসি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে জালকুড়ি, শহরের জল্লারপাড়, আমলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় লাখ মানুষের নাকের ডগায় ফেলে আসছে বর্জ্য।

সবকিছু পরিকল্পনা মত হয় এমন দাবি করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তারা জানিয়েছে, নগর সুন্দর ও পরিকল্পনা মোতাবেক করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কাজ করে থাকে। কোন ব্যক্তি ভবন বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চায় তবে রাজউকের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এর জন্য সিটি কর্পোরেশন কোন অনুমোদন দেয় না।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের আইন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের দূষণ থেকে নারায়ণগঞ্জকে বাঁচাতে প্রয়োজন রাষ্ট্র থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়েও সতর্কতা অবলম্বন করা।
না.গঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণে দূর্ভোগ সীমাহীন
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, প্রতিটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে শিল্পকারাখানা ও আবাসনের জন্য পৃথক অঞ্চল নির্ধারিত রয়েছে। আমাদের শহর সেভাবে পরিকল্পনামাফিক গড়ে ওঠেনি। এজন্য দাবি করলেই নারায়ণগঞ্জে আবাসিক এলাকাগুলো রাতারাতি স্বপ্নের মতো সুন্দর কিংবা বিশৃঙ্খলা ও অবৈধ স্থাপনামুক্ত হবে না। এটি পরিকল্পনা করেই সুন্দর ও বাস-উপযোগী করতে হবে। তাই রাষ্ট্র ও জনগণ সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রশাসনকে রাখতে হবে বিশেষ ভূমিকা। আবাসন কোম্পানিগুলো যাতে অবৈধ প্রকল্প গড়ে না তোলে সে ব্যপারে প্রশাসন সতর্ক থাকলেই সম্ভব নারায়ণগঞ্জকে সুন্দর রূপে ফিরে পাওয়া সম্ভব।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম