Wed, 20 Sep, 2017
 
logo
 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপিত

সিটি করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জঃ “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লেখায় বিশ্ব-সভ্যতার বিনির্মাণে নারী ও পুরুষের অবদান সমান কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারনে নারীদের প্রতিদ্বন্দী হিসাবে পুরুষকে গণণা করা হচ্ছে।

বুধবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মজয়ন্তী। এদিকে নারায়ণগঞ্জে নীরবে পালিত হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী। এ উপলক্ষে কোন আয়োজন ছিলো না। এব্যপারে জেলা শিল্পকলা একাডেমি’র কালচারাল অফিসার সৈইয়াদা সাহিদা বেগম লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান, আজ (২৫ মে বুধবার) আমাদের কোন আয়োজন ছিলো না। ২৯মে আমাদের একটি আয়োজন রয়েছে।


তিনি চির প্রেমের কবি। তিনি যৌবনের দূত। তিনি প্রেম নিয়েছিলেন, প্রেম চেয়েছিলেন। মুলত তিনি বিদ্রোহী কিন্তু তার প্রেমিক রুপটিও পবাদপ্রতীম। তাই মানুষটি অনায়াসেই বলতে পারেন ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়।’ পৃথিবীতে এমন কয়জন আছেন যিনি প্রেমের টানে রক্তের সর্ম্পকে অস্বীকার করে পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন ? তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপিত

বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন। তাঁর ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন।

 

জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কবিকে নিয়ে নিবন্ধ। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন সহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠান মালা ।

 

দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা কবির জন্মবার্ষিকীর দিনটি জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালবাসায় উদযাপন করবে। এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে চট্রগ্রামে। এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপিত

বাংলা কবিতায় নজরুলের আর্বিভাব একেবারেই উল্কার মত। বাংলা সাহিত্যে আর্বিভ’ত হয়ে সমস্ত আকাশকে কিভাবে রাঙ্গিয়ে গেলেন অথবা উজ্জ্বল করে দিলেন তা নিয়ে এখনো গবেষণা হচ্ছে দেশ-বিদেশে। কোন সঞ্জীবনি মন্ত্রে তিনি উচ্চকন্ঠে বলতে পারেন ‘ বল বীর,বল উন্নত মম শির’ অথবা মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-’।

 

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণা বন্ধ হয়নি কিংবা উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোলও কখনো থামেনি। আর সেই কারণেও নজরুল আমাদের কাছে এখনো প্রাসঙ্গিক। আসলে বিদ্রোহী কবি যেমন ছিলেন নির্ভীক, তেমনি এই প্রেমিক কবি ছিলেন রোমান্টিক। রোমান্টিকতার আতিশয্য ও অভিমানে ভরা তার অনেক গান গত শতকের অনেকটা সময় ধরে বাঙ্গালীর হৃদয়রাজ্যে বিচরন শুরু হয়-যা আজও দিপ্যমান।

 

সংগীত বিশিষ্টজনদের মতে রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তি নজরুলের গান অনেকটাই ভিন্ন ধরনের নির্মাণ। অধিকাংশ গান সুরপ্রধান। বৈচিত্রপূর্ণ সুরের লহরী কাব্যকথাকে তরঙ্গায়িত করে এগিয়ে নিয়ে যায়। সুরের বিন্যাসের উপরে কথা ঢলে পড়ে। তার গানে বহু গায়ক সুর-স্বাধীনতা ভোগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে গায়ক সুরের ঢেউয়ে বেশী মেতে যান। তখন গান হয়ে যায় রাগপ্রধান।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপিত

নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, নজরুল ইতিহাস ও সময় সচেতন মানুষ ছিলেন যার প্রভাব তাঁর লেখায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তরঙ্গকে নজরুল তাঁর সাহিত্যে বিপুলভাবে ধারণ করেছেন।

 

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তার কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। তাঁর লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বপরিবারে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন।

এদিকে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ উত্থানের এ সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে জানিয়েছেন কবির জন্মজয়ন্তীর প্রধান অনুষ্ঠানের বক্তারা।

 

বুধবার চট্টগ্রাম এম এ আজিজ আউটার স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয় জাতীয় পর্যায়ে কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান। বেলা সাড়ে ১১টায় সমবেত জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এখন থেকে কবির স্মৃতিধন্য দেশের সব এলাকায় পর্যায়ক্রমে জন্মজয়ন্তী উৎসব আয়োজন করবে। চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো নজরুলকে নিয়ে এ ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়।

 

অনুষ্ঠানের স্মারকবক্তা কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন জানান, নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি। শান্তির পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য কলম ধরেছিলেন তিনি। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশসহ বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের এ সময়ে নজরুল দর্শন উত্তরণের পথ হতে পারে বলে মনে করেন অনুষ্ঠানের স্মারক বক্তা।

 

চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো এই আয়োজনে উদ্বেলিত নগরবাসী। সরকারের এ সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিরা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার থাকলেও তিনি আসতে পারেননি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল দুপুরের পর বৈরী আবহাওয়া থাকবে। এ কারণে রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল করা হয়েছে।

 

অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক দর্শক। বিশেষ করে সমগ্র আয়োজনটিকে ঘিরে উদ্বেলিত ছিলেন কবি পরিবারের সদস্যসহ সংগীত অনুরাগী ও নজরুল সংগীতশিল্পীরা।

 

কাজী নজরুলের পৌত্রী খিলখিল কাজী বলেন, দাদু অনেক উল্লেখযোগ্য রচনা চট্টগ্রামে বসে করেছেন। সে জন্য চট্টগ্রাম তাদের পরিবারের খুবই প্রিয়। এখানে আসতে পেরে ভালো লাগছে।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বের পরিবেশনায় অংশ নেন নজরুলসংগীতশিল্পী ও কবির সৃষ্টিসম্ভারের অনুরাগীরা।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪