Mon, 19 Nov, 2018
 
logo
 

‘রফিউর রাব্বিকে একটি মহীরূহ বলে মনে হয়’

তরিকুল সুজন: রফিউর রাব্বি। জন্ম ১৪ অক্টোবর ১৯৫৮, নারায়ণগঞ্জ। শহরে। বাবা ডা.শাহাদাত হোসেন। মা আনোয়ারা হোসেন। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল, তোলারাম কলেজ, চারুকলা ইনন্সিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্কুয়েলা সুপিরিয়র নিকোয়েলাপেজ হাভানাতে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পাঠে কখনো আগ্রহ গড়ে উঠে নি।কৈশোর থেকেই শিল্প-সাহিত্য-লেখালেখির সাথে যুক্ত। ৭০ দশকে প্রথমে ছাত্র পরে রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। ৯০ এর পর থেকে সুনিদিষ্ট রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকলেও তিনি রাজনীতি নিরপেক্ষ নন। সমাজের ক্রিয়াশীল অনিবার্য দ্বান্ধিক পরিবর্তনের প্রতি বরাবরই তিনি আস্থাশীল।

রফিউর রাব্বি সর্ম্পকে এভাবেই লিখা আছে তার প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থে। কিন্তু এ পরিচয়ের বাইরেও আছে তার আরো অনেক পরিচয়। রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত না তার জন্মস্থান নারায়ণগঞ্জকে ঘিরেই রয়েছে তার অদম্য আকাক্সক্ষা, একটি বাসযোগ্য সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ নারায়ণগঞ্জ। এই শহরের অলিতে-গলিতে যেমন ছড়ানো আছে তার হাজারো সুখ স্মৃতি তেমনি হাজারো সুখ স্মৃতিকে মুছে বেদনা মুছড়ে দেবার মত একটি ঘটনায় যথেষ্ট।

 

সালটা ২০১৩। উত্তাল মার্চ। শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। উত্তপ্ত শাহবাগের সাথে নারায়ণগঞ্জ শহীদ মিনারে রফিউর রাব্বি নেতৃত্বে চলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন। তারিখটা ৬ মার্চ। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রফিউর রাব্বির বড় সন্তান তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। আত্বীয়-স্বজন, হাসপাতাল, থানা এমনকি ত্বকীকে খুজে পাবার সম্ভাব্য জায়গাগুলো খুজেও ত্বকী পাওয়া যাচ্ছে না। র‌্যাব-পুলিশ-থানায় যোগাযোগ করে ত্বকীকে খুজে বের করার জন্য তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ৬ মার্চ এর কালো রাত পেরিছে কিন্তু কাক্ষিত সকাল আসে নি । ৭ মার্চও ত্বকী বাসায় ফিরে নি। ৮ মার্চ সকাল ১০টায় ত্বকীর মৃত দেহ উদ্ধার করা হয় শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে কুমুদিনীর খাল থেকে। মৃত ত্বকীকে পিতা রফিউর রাব্বি চিনতে পারেনি। ত্বকীর জামা-কাপড় দেখে তিনি চিনে ছিলেন এই তার সন্তান তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। যাকে বুকে আগলে রেখে মানুষ করেছিলেন, সেই ত্বকীকে কুমুদিনীর খালে পড়ে থাকতে দেখে তিনি চিৎকার করে কেদেঁ উঠেছেন।

 

স্বল্প এবং স্পষ্টভাষী। যারা তার সাথে ঘনিষ্ট তাদের অনেকের ই মনে হবে রফিউর রাব্বি গুনে গুনে কথা বলেন। আসলে তা নয়। যথেষ্ট রসবোধ সম্পন্ন এক আত্বমর্যাশীল মানুষ। ধর্মীয় গোড়ামির বাইরে এক সামাজিক দায়িত্বশীল মানুষ। নারায়ণগঞ্জই কেবল নয় নারায়ণগঞ্জের বাইরেও অনেক মানুষ গড়ে তুলেছেন ।এখন যারা নারায়ণগঞ্জে সংস্কৃতিতে-রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রফিউর রাব্বিই তাদের দায়িত্ব নিয়ে গড়ে তুলেছেন। এমনকি ত্বকী হত্যার পরে ১৫ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহীদ মিনারে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ত্বকী মারা যাবার পর ত্বকীর বয়সী সকলে দায়িত্ব আমাকে দিয়ে গেছে।

 

রফিউর রাব্বি এখন একটি মহীরূহ। বট বৃক্ষ। যিনি বুক আগলে এই শহরকে একটি নিরাপদ বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলবার জন্য প্রতিদিন লড়াই করছেন। মাফিয়া-গডফাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। হুমকি-জেল-মামলা-রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মোকাবিলা করে ‘ত্বকীসহ সকল হত্যার বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ করছেন,বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।

 

আজ ১৪ অক্টোবর রফিউর রাব্বির ৬০তম জন্মদিন। ১৩ অক্টোবর রাতে জন্মদিনকে কেন্দ্র করে তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন ‘মহাকালের হিসেবে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র হলেও ষাটটি বছর কম নয়। পেরিয়ে এলাম। পেরোনোর হিসেবটা জানা কিন্তু সামনেরটা অজ্ঞাত। সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের হিসেবে আমি সৃষ্টি আর স্থিতিটাকেই সত্য বলে জানি। লয়কে নয়। মৃত্যু কখনোই জীবনকে ছাপিয়ে যেতে পারে না বলেই আমি মানি। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের রূপান্তর ঘটে, জীবন পূর্ণতা পায়। আমার কাছে এইটি জীবনের 'ম্যাটামর্ফোসিস'। সূর্য্টা সত্য। এর উদয়টাকে আমি মানি, অস্তটাকে উদয়েরই জন্মযন্ত্রণা বলে জানি।’

লেখক: তরিকুল সুজন
সমন্বয়ক - গণসংহতি আন্দোলন

 

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম