Sun, 23 Sep, 2018
 
logo
 

‘এটা শুভ্র’র লাশ নয়’


গোলাম রাব্বানী শিমুল
এমন দিনে কী বলতে হয় শুভ্র? এক পৃথিবী কথার মধ্যে কোন কোন শব্দগুলো লিখতে হয়?
একবছর আগের ঠিক এই রাতটার কথা মনে পরছে খুব। মনে পড়ছে তোকে ফিরে পাবার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। একা একটি কক্ষে। রাত সোয়া দুইটা, আমার ফোন বেজে উঠলো। সাংবাদিক বাঁধন ভাই ফোন দিয়েছে। "শিমুল, দাদা লাশটা ভালো করে দেখছো? আমার কিন্তু সন্দেহ হয় লাশটা নিয়া। একটু ভাল কইরা দেখো তোমারে ছবি পাঠাইতাছি"!

আমার সমস্ত অস্তিত্ব, বিশ্বাস, আর শক্তি আল্লাহর কাছে বলছিলো 'হে আল্লাহ এই লাশ যেন শুভ্রর লাশ না হয়।' আর বাঁধন ভাইকে বলেছিলাম আমি শুভ্রকে চিনি, ওর মুখ আমার কাছে অপরিচিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
ছবি আসলো। রক্ত আমার শীতল হয়ে এসেছে। নিশ্বাস বন্ধ। বারবার বিভৎস একটি লাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। আর নিজেকে ভরসা দিচ্ছি, না এই লাশ শুভ্রর না। তীব্র একটা বিশ্বাস, এই লাশ তোর না হলেই যেন তোকে ফিরে পাবো।
আবারও ফোন, "দাদা, আমি শিওর এই লাশ শুভ্রর। ও আর নাই দাদা"......
আমি বারবার সেই লাশ দেখেছি। সমস্ত সততা দিয়ে আল্লাহর কাছে বলেছি, আল্লাহ এই লাশ যেন শুভ্রর না হয়।
বিশ্বাস হয়নি এই লাশ তোর। কীভাবে বিশ্বাস করি? তোর এই মুখ কতো হাজারবার দেখেছি। তোর শরীরের গন্ধ, তোর মাথার চুল, পায়ের নখ; সবইতো আমার চেনা। এই চিরচেনা মুখটা একদিনে এমন অচেনা করে দিতে পারে এমন নরপিশাচও যে এই সমাজে আছে এমনটাতো ভাবতেও পারিনি শুভ্র।
পরদিন ভোরে তোর শার্ট দেখে তোর লাশ শনাক্ত হলো। তোর বাবা মূর্ছা গেলো, মা বিলাপ করলো। সকলেই কাঁদছে। আমার কিন্তু কান্না আসেনি একবারও।
আমার বিশ্বাস সবাই ভুল করছে। তোর বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন পুলিশ সবাই ভুল। কেবল আমিই ঠিক। তীব্র বিশ্বাস তুই ঠিকই সবাইকে চমকে দিয়ে হুট করে এসে এসে বলবি "কী, কেমন চমকে দিলাম?"
আমি বারবার জোর গলায় বলেছি এটা শুভ্রর লাশ না। তোর মামার সঙ্গে তর্ক করেছি। ভয় ছিলো -যদি ভুল লাশকে আমরা শুভ্র ভেবে দাফন করে ফেলি; আর তুই সত্যিই কোন বিপদে পড়ে যাস। তবে আর কেউ তোকে উদ্ধারের চেষ্টা করবে না।
তোর ফিরে আসার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে যখন অপেক্ষা করছি; তখন তোর মৃত্যুকে মেনে না নিতে পারার কারণে আমাকে থানায় আটক করা হলো। আর শা¯িÍ হিসেবে তোর কবরে মাটি দেয়া থেকে বঞ্চিত করা হলো আমাকে। আমি বারবার চিৎকার করলাম, অন্তত জানাজাটা পড়তে দিন। কিন্তু তা হলো না। কেউ কেউ কিছু সময়ের জন্য আমাকেই হত্যাকারী হিসেবে সন্দেহ করতে লাগলো।
আমি তোর কবরে মাটি দিইনি শুভ্র। মৃত্যুর পর কান্নাও করিনি (কখনো কখনো আবেগ প্রবণ হওয়া ছাড়া)। কারণ আমি আজও বিশ্বাস করি, তোর মৃত্যু হয়নি। সত্যিই সকল যুক্তিকে ভুলে গিয়ে আজও বিশ্বাস করি সেই লাশ তোর লাশ না। তুই ঠিক বেঁচে আছছ। ঠিক একদিন ফিরে আসবি। বলবি বন্ধুদের চিনে নিয়েছো এবার বাকিদের ঝাটা দিয়ে বিদায় করো। মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ না, এ যুগে যাকে তাকে বন্ধু ভাবাটাই পাপ। আমরা তোর বাবাকে চিকিৎসা করাতে ভারত নিয়ে যাবো। বোনকে নিজ হাতে বিয়ে দিবি। আমি আর তুই ঢাকায় গিয়ে সাংবাদিকতা করবো। একই বাসায় থাকবো। আমরা একদিন গভীর রাতে বের হয়ে হিমালয়ে চলে যাবো কোন এক ধ্যান সিদ্ধ সাধুর খোঁজে। তার সঙ্গ পেয়ে আমরা দুজন পবিত্র হবো। আমরা মানুষ হবো। আমাদের হৃদয় হবে হিমালয়ের মতোই মহান আর শুভ্র। (লেখক: প্রথম আলো’র নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা)

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম