Wed, 21 Nov, 2018
 
logo
 

খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে : তৈমূর আলম

লাইভ নারায়ণগঞ্জ : বিসমিল্লাহীর রহমানির রাহিম। সরকারী ঘননায় বুদ্দিজীবিদের নুতন টেনশন বিএনপি কি পথ হারাবে? লন্ডন প্রবাসী একজন সিনিয়র কলামিষ্ট যাকে “আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি” ঐতিহাসিক গানের রচিয়তা হিসাবে শ্রদ্ধা করি, তিনিও তার বিভিন্ন লেখায় বিএনপি’র পথ হারানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি একজন বলিষ্ট কলামিষ্ট সন্দেহ নাই, তবে তিনি সরকার সমর্থনে থাকায় লেখাগুলি এক পেশে, যা তার মত লেখকের নিকট থেকে জাতি আশা করে না। যেহেতু আমার লেখায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কট্টর সমালোচনা থাকে, সেহেতু আমার কলামকেও এক পেশে বলতে পারেন, তবে অন্ধত্বকে আমি সমর্থন করি নাই, জ্ঞানত: বিশেষ করে নিজেদের সমালোচনার ক্ষেত্রে। বন্ধু প্রতীম মহিউদ্দিন আহাম্মদ (সাবেক সচিব ও রাষ্ট্র দূত) বিএনপি’র অস্থিত্ব সংকট নিয়ে জ্ঞানগর্ভ কলাম লিখেছেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিএনপি কেন অস্থিত্ব সংকটে পড়লো একথা কিন্তু সরকারী ঘরনার বুদ্দিজীবিদের কলম থেকে বের হয় না। এতোদিন সরকারের সাথে সূর মিলিয়ে বুদ্দিজীবিরা বলছে বিএনপি আগুন সন্ত্রাস করেছে। ২০১৫ সালের পরে তো আর কোন আগুন সন্ত্রাস কোথাও দেখা যায় নাই (বিএনপি’কে জেলে ঢুাকানোর মামলা দেয়ার জন্যও আগুনের অনেক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। একই বাস দুই বার পুড়িয়ে নারায়নগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা রুজু করা হয়েছিল)। তবে এখন দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কেন সিরিজ মোকদ্দমা হচ্ছে? এখনো কেন বিএনপি নেতাকর্মী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় রিক্সা চালায়? এখন কেন থানায় থানায় কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে বিএনপি ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতাকর্মী, সমর্থক ও তাদের আতœীয় স্বজনদের বিরুদ্ধে ভূতুড়ে মামলা সাজিয়ে গ্রেফতার, রিমান্ড, জেল গেইটে পুন: গ্রেফতার করে চড়া মূল্যে বানিজ্য করা হচ্ছে? এই বানিজ্য করার কাহিনী সরকারী ঘরনার কোলকাতা মনস্ক বুদ্দিজীবি লিখেন না কেন? এ দেশের সার্বিক জনগোষ্টির প্রতি কি তাদের কোন দ্বায় দায়িত্ব নাই?

০৪/৯/২০১৮ ইং তারিখে একটি বহুল প্রচারিত প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিকের (২০ দলীয় সমর্থিত পত্রিকা নহে) সম্পাদকীয়তে বিএনপি’কে কি ভাবে পুলিশী নির্যাতনের মূখে ফেলে দেয়া হয়েছে তার একটি চিত্র তুলে ধরছে। সম্পাদকীয়তে অন্যান্য বক্তব্যের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নি¤œরূপ :-

“পুলিশ প্রশাসনের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তা সরকারকে খুশি করতে এ ধরনের হঠকারী কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত যে মামলা টেকে না, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। বর্তমান সরকারের সময় বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করলেও পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। বরং এসব রাজনৈতিক মামলাকে কেন্দ্র করে পুলিশের উৎকোচ-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। বিএনপির যেকোন রাজনৈতিক কর্মসূচী বা সভা-সমাবেশর মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজা হাস্যকরও বটে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের ষড়যন্ত্র আবিস্কারে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী-ই নয়, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদেরও তৎপর দেখা যায়। শরীয়তপুরে বিএনপির এক নেতার বাড়ীতে আয়োজিত বৈঠকে হামলা হয়েছে ও বগুড়ায় ছাত্রলীগের হামলায় যুবদলের তিন কর্মী আহত হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিস্ক্রিয় থাকে। তাদের যেখানে সক্রিয় হওয়ার কথা, সেখানে নিস্ক্রিয় থাকা, আর যেখানে নিস্ক্রিয় থাকার কথা, সেখানে অতি সক্রিয় হওয়া আইনের শাসন কিংবা গণতন্ত্রের সহায়ক নয়।” উক্ত সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত চিত্র শুধু দেশের কোন নির্দিষ্ট এলাকার নহে, বরং এটা গোটা বাংলা দেশের চিত্র। কোনটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, কোনটা হয় না। তবে দু:ক্ষজনক এই যে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে “মিথ্যা” বলাতে বিশেষ করে মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলকে ফাসাতে যে ভাবে অভ্যস্ত করা হয়েছে তাতে সকল সময়ের রেকর্ড পুলিশ এবং এ সরকার ভঙ্গ করেছে যার কারণে মিথ্যার জন্য ডক্টরেট বা গিনিসবুকে তাদের নাম লেখানো যায়।

“খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে” এ বাক্যটি দীর্ঘদিনের বহুল প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত প্রবাদ। রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে করায়ত্ব করে শেখ হাসিনা সরকার বিনা ভোটে একতরফা নির্বাচনের যে সংস্কৃতি চালু করলো, যে সরকার বিএনপি’র শুধু নেতাকর্মী নহে সমর্থকদের পর্যন্ত কাল্পনিক ভৌতিক মামলা দিয়ে নাজেহাল করছে, বিএনপি’র নাম গন্ধ পেলে যেখানে চাকুরী জীবিদের প্রমোশন হয় না, যেখানে সরকারের মন্ত্রীর বক্তব্যে আগামী এক মাসের মধ্যে বিএনপি’র বড় বড় নেতাদের সাজা হওয়ার আগাম বার্তা বহন করে এবং যেখানে আদালতের বিশেষ করে নি¤œ আদালত থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা আইনগত কোন প্রকার প্রটেকশন পায় না সেখানে বিএনপি নির্মূলকারীদের সমর্থকদের মূখে যখন বিএনপি’র পথ হারানোর মায়া কান্না শোনা যায় তখন স্বাভাবিক ভাব্ইে “খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে” প্রবাদটির যৌক্তিকতার কথা স্বারণ করিয়ে দেয়।

বিএনপি চেয়ারপার্সন কারাগারে যাওয়ার পূর্বেই দেশব্যাপী প্রতিথানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক মামলার এজাহারের একই ভাষায় যেমন “খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য নাশকতা করার পরিকল্পনার” অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তারা সিরিজ মোকদ্দমা রুজু করে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে আটক ও রিমান্ড বানিজ্য করে বিএনপি’কে নি:শেষ করতে চেয়ে ছিলো। এখন নতুন করে আবার শুরু হয়েছে দেশের স্বার্বভৌমিকতা নস্যাৎ করার জন্য নাশকতার পরিকল্পনা করার অভিযোগে থানায় থানায় একই ধারায় একই ধরনের মামলা রুজু করে পূর্বের ন্যায় বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী, নেতাকর্মীদের ঘর ছাড়া করছে। এ সম্পর্কে কিন্তু দেশের বুদ্দিজীবি, সরকারী ঘরনার কলামিষ্টদের কোন রা নাই। অনেকেই বলে যে, বিরোধী দলে থাকলে সরকারী নির্যাতন ভোগ করতেই হয়। একথা যদি সত্য হয় তবে বৃটিশ ও পাকিস্তানী পুলিশ যে ভাবে বিরোধীদের নির্যাতন করতো, স্বাধীন দেশের পুলিশতো আরো কঠিন ভাবে নির্যাতন করে। যতি তাই হয় তবে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রইলো কোথায়?

“বিএনপি নাই” এ কথা হক ডাক দিয়েই ক্ষমতাসীনরা বলে আসছে। এমন কথা আমলা থেকে মন্ত্রী ভায়া জাতীয় পার্টী বর্তমানে অর্থ মন্ত্রীও তুচ্ছ তাচ্ছিলের সাথে বলে থাকেন যে, দেশে কোথায় বিএনপি? পুলিশ প্রটেকশনে থেকে এমন কথা বলা অনেক সহজ, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হলে এই পুলিশের ব্যবহারে বুঝা যায় যে, কে কতটুকু ক্ষমতা বান (!)।

একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্রে শুধু সরকার ও তাদের সমর্থকরা নিরাপদে থাকবে, বাকী সব থাকবে নিরাপত্তাহীনতায়, যে রাষ্ট্রের সংবিধানকে একটি কাগজে ছাপানো একটি বই মনে করে প্রয়োজনে ব্যবহার, প্রয়োজনে অপব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে স্বাধীনতার মূল্যবোধ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়?

সরকার কথায় কথায় স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশটি স্বাধীন হয়েছে যার ফলশ্রুতিতে প্রণীত হয়েছে একটি সংবিধান। সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ যা নি¤েœ উল্লেখ করা হলো ঃ-

“(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।

(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।”

সংবিধান যদি জনগণের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রধান দলিল হয়ে থাকে তবে এই সংবিধানে “প্রজাতন্ত্র” বলতে যা বুঝানো হয়েছে এবং জনগণের অধিকার তাতে কি বিএনপি সমর্থক জনগণ কি বঞ্চিত নয়? যদি তাই হয় তবে সংবিধানকে সার্বিক ভাবে নহে বরং শাসক গোষ্ঠির কল্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কি সংবিধানকে এখন এক পেশে বলা হবে?

বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর জন্য সরকারী দলের পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলারা উঠে পড়ে লেগেছে। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন হলে তাদের সম্পদের হিসাব সহ অতিউৎসাহীত হয়ে বিরোধীদের দমনের হিসেব দিতে হবে কড়ায় গন্ডায়। দুদক সম্পদের হিসেবের পূর্বেই তাদের স্ত্রী/সন্তানদের গায়ে হাত দিবে। একজন অভিজ্ঞ মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন যে, তারা পুনরায় ক্ষমতায় না বসলে বিএনপি জামাত ১ লক্ষ লোককে খুন করবে। কথা বেশী বলেন এমন একজন বলেছেন ৫ লক্ষ। আতঙ্ক তো তাদের মধ্যেই। অন্ধকারে কেহ ভয় পেলে তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে। ক্ষমতাসীনদের মানসিক অবস্থা সে দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যখন নিজেরা নিজেদের উপর আস্থা রাখতে পারে না, তখনই আতঙ্ক গ্রস্থ হয় এবং মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে রাষ্ট্রে এখন মিথ্যাকেই জাতীয়করণ করা হচ্ছে।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই শত হাজার মিথ্যা মামলা, মিথ্যা চার্জশীট, হয়রানীর পর হয়রানী। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণকে এতো হয়রানীর দরকার কি? সংবিধানের পরিবর্তনতো ক্ষমতাসীনদের হাতে। সংবিধানে এমন যদি পরিবর্তন আনা যায় যে, এম.পি’র উত্তারাধিকার বংশানুক্রমে এম.পি অনুরূপ ভাবে মন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রী বংশানুক্রমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে তবে তো জনগণের কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্বাচন নামক প্রহসনের দরকার হয় না। অন্যদিকে মিথ্যাকে জাতীয়করণ করা থেকে রাষ্ট্র ও মিথ্যা কাল্পনিক মোকদ্দমা থেকে জনগণ রক্ষা পেতো।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম