Sat, 18 Aug, 2018
 
logo
 

মে দিবসের চেতনাকে আড়াল করে শুধু'ই উৎসবে পরিণত করা হচ্ছে

এম এ শাহীন: ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সারা দুনিয়াতে যথাযথ মর্যাদার সহিত উদযাপিত হয়েছে। তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও সভা-সমাবেশ ও মিছিল সহ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমিক মেহনতি মানুষ তা উদযাপন করেছে। তবে নারায়ণগঞ্জ সহ সারা দেশে মে দিবস উদযাপনে এবার ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে।

১৮৮৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরি ও অধিকারের দাবীতে যে রক্তক্ষয়ী ও আত্মত্যাগী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল সেই সত্যটিকে যেনো আজ চাপা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনে মহান মে দিবসকে আজ শুধু'ই উৎসব আনন্দের দিনে পরিণত করা হচ্ছে।বিশ্ব খ্যাত মে দিবসের যে মর্ম বাণী ও চেতনা তা উপলব্ধিতে নিয়ে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষ যাতে পূঁজিবাদী অপকৌশলের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায় এবং শোষক গোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যাতে বিদ্রোহ করার মনোভব সৃষ্টি না হয় তার জন্য পূঁজিবাদীরা কৌশলগত ভাবে মে দিবসের চেতনাকে আড়াল করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। আমাদের পূঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মালিক শ্রেণি কৌশলগত ভাবে প্রচার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে মে দিবসের চেতনা কে আড়াল করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এটাকে শুধু'ই একটি উৎসব আনন্দের দিন হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

 

আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ও নামধারী শ্রমিক সংগঠন যারা কখনও শ্রমজীবি মানুষের কোন প্রকার সংকটে পাশে দাঁড়ায় না বা শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজপথে দেখা যায় না তারা পূঁজিবাদীদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মে দিবসকে ভিন্ন ভাবে শ্রমিকদের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ট্রাকে করে মিউজিক সেট নিয়ে শ্রমিকদের কে নাচ-গানে উল্লাসে মগ্ন রেখে প্রকৃত বিষয়টাকে চাপা দিতে চাইছে। আবার প্রগতিশীল কতিপয় শ্রমিক সংগঠন মে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে শ্রমজীবী মানুষকে অনুপ্রাণিত করার চাইতে মে দিবস উদযাপন করাকে কেন্দ্র করে স্ব-স্ব সংগঠনের নামে যে সব প্রচার পত্র বিলি করছে তাতে কে কত বড় শ্রমিক নেতা, কে প্রধান অতিথি, কোথায় কি অনুষ্ঠান হবে সেখানে শ্রমিকদের যোগদানের আহবান জনাচ্ছে।অথচ মে দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে দুই চার লাইন লিখে শ্রমজীবি মানুষকে জানানোর প্রয়োজন মনে করছেনা। এসব প্রচারণায় নেতৃত্বের খানিকটা প্রসার হতে পারে তবে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সংগ্রাম একটুকুনও অগ্রসর হবে না। প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠন গুলোর এসব প্রচার প্রোপাগান্ডা দেখে শ্রমজীবি মানুষ গুলো আজকে আশাহত হয়ে পরছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিশ্বস্ত সংগঠন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র কেই আশাহত শ্রমিকদের মাঝে শোষণ মুক্তির স্বপ্ন জাগাতে হবে। তাদের স্বার্থ রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষকে অধিকার স্বচেতন করে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে তিব্র লড়াই সংগ্রাম গড়ে তুলার মাধ্যমে পূঁজিবাদের কৌশলী আক্রমন রুখে দিতে হবে।

 

বাংলদেশ পূর্বে পাকিস্তান সময়ে ২২ পরিবারের শোষণের বিরুদ্ধে বীর বাঙালীরা শোষণ মুক্তির সংগ্রাম করেছে। মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছে। আর এখন স্বাধীন দেশের মালিকরা স্বাধীন ভাবে এদেশের শ্রমিকদের মাত্রাতিরিক্ত শোষণ-নির্যাতন করে চলেছে। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে সস্তা শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে তারা একটা কারখানা থেকে ১০/২০ এমনকি তারও বেশি কারখানার মালিক হয়ে যাচ্ছে। দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে অথচ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে তারা কোন কাজ করছেনা। শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন, কর্মক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা, বাসস্থান, রেশন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ কোন সুযোগ সুবিধা তারা দিচ্ছে না। পাকিস্তান সময়ের শোষকদের যে কারখানা ছিল আদমজী জোট মিল, লতিফ বাওয়ানী জোট মিল, এসব কারখানায়ও তখন শ্রমিকদের জন্য কলোনী ছিল, হাসপাতাল ছিল, শ্রমিকদের রেশন দেওয়া হতো, শ্রমিকের সন্তানদের লেখা-পড়া জন্য স্কুল-কলেজ ছিল, বিনোদন কেন্দ্র ও খেলার মাঠ ছিল। সেই সব সুবিধা গুলো থেকে এখন স্বাধীন দেশের গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করছে।

 

যে লক্ষ্য নিয়ে মে দিবস ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল তা আজও আমাদের দেশের শ্রমিকরা অর্জন করতে পারেনি। মে দিবসের ১৩২ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এদেশের শ্রমিকরা মে দিবসের সুফল পায়নি। তারা আজও ৮ ঘন্টা কাজ, ন্যয্য মজুরি ও অধিকার বঞ্চিত, শোষিত-নির্যাতিত এবং অগণতান্ত্রিক কালাকানুনের বেড়াজালে আটকা পড়ে রয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এটাই প্রমাণ করে যে সু-সংগঠিত শক্তি প্রদর্শন তথা বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলা ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। পূঁজিবাদী ধনীক শ্রেণীর শাসন ব্যবস্থা শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস ও বিপথে পরিচালিত করতে চায়।পূঁজিবাদের এই হিংস্রতম কৌশলী আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এই বিশাল শক্তিকে মোকাবেলা করতে প্রয়োজন শ্রমিকের ঐক্য ও শক্তিশালী সংগঠন। মে দিবসের সংগ্রামী চেতনা ধারণ করে এদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শোষণ মুক্তির লড়াই সংগ্রাম অগ্রসর করতে হবে।

 

লেখক: এম এ শাহীন

সভাপতি: নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম