Fri, 25 May, 2018
 
logo
 

প্রতারণার ফাঁদ: কষ্টি-পাথরের মূর্তি

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: প্রায় দুই যুগ ধরে দেশী-বিদেশী সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র একের পর এক সহজ সরল অর্থ-লোভী মানুষদেরকে অর্থের লোভ দেখিয়ে অভিনব কৌশল অবলম্বন করে কষ্টিপাথরের মূর্তি ক্রয়-বিক্রয় করার নামে লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে।

হাজার হাজার বছর পূর্ব হতেই ভারত বর্ষের সনাতন/ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কষ্টি-পাথরের মূর্তি ধর্মীয় উপাসনার স্থানে রেখে পূজা উদযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতো। কালের বিবর্তনে কষ্টিপাথরের পাহাড় সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর প্রায় দুই শতাধিক বছর হতে কষ্টিপাথরের মূর্তি বেসরকারিভাবে তৈরী করা কমতে থাকে।

শুধুমাত্র স্বর্ণ যাচাই করার জন্য কষ্টিপাথরের ছোট-ছোট খন্ড আকারে ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য সরকারের নির্দেশনা অনুসারে বেসরকারি ভাবে স্বর্ণকারদের দোকানে রাখার নিয়ম চালু হয়। যাহা অদ্যাবধি প্রচলিত রহিয়াছে। কিন্তু প্রতারক চক্র কোন মন্দির থেকে চুরি করে বা কোনো মাটির নীচে পেয়ে বা যেকোনো ভাবে তাদের সংগ্রহে কষ্টিপাথরের মূর্তি আছে জানান দিয়ে অর্থ-বিত্তশালী লোভী প্রকৃতির লোকদের লোভের জালে বন্দী করে কখনো পঞ্চাশ লক্ষ কখনো এক কোটি কখনো পঞ্চাশ কোটি পর্যন্ত দাম চেয়ে থাকে।

প্রতারক দলের সদস্যগন চার ভাগে ভাগ হয়ে থাকে। প্রথমভাগ-বিদেশী হিন্দু অথবা বৌদ্ধ। দ্বিতীয়ভাগ-ঢাকার কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের। তৃতীয়ভাগ-মধ্যেস্তাকারী। চতুর্থভাগ-মূর্তি হেফাজত কারী। পঞ্চমভাগ-নকল পুলিশ। তৃতীয় ভাগ তার সাধ্যে মতো লোভী প্রকৃতির কাচা পয়সার মালিক দেখে একজনকে টার্গেট করে সুকৌশলে পরিচয় হয়।

বেশ কিছু দিন চলাফেরা করার পর একদিন মুখ ভার করে দেখা করবে। কাঁচা পয়সার লোভী মানুষটি যখন বলবেন মুখ ভারী কেনো ভাই। তখন প্রতারক সদস্য অভিনয় করে বলবে ভাই এমন একটি জিনিসের সন্ধ্যান পেয়েছি যে আমার হাতে টাকা থাকলে কিনে এনে বিক্রি করে যেই লাভ পেতাম তাদিয়ে সারা জীবন বসে খাইতে পারতাম। কি করি ভেবে পাচ্ছিনা। খুব খারাপ লাগছে তাই আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি। লোভী লোক তখন বলবে ভাই জিনিসটা কি? ভাই কষ্টি পাথরের মূর্তি। আমার এক পরিচিত লোক পেয়েছে। আমাকে দেখাইছে।

পুলিশের ভয়ে গোপন স্থানে রেখেছে। আমি আমার পরিচিত ঢাকার এক বড়লোকের সাথে কথা বলেছিলাম। সে বলেছে দুই কোটি টাকা দাম দিবে কিন্তু তার বাসায় পৌছাইয়া দিলে তবেই টাকা দিবে। এদিকে মাল যার কাছে আছে সে বলছে এক কোটি টাকা নগদ হলে বিক্রি করবে। আমার কাছে মাত্র বিশ লক্ষ টাকা আছে বাকি আশি লক্ষ টাকা আপনি বা আপনার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিলে যদি দেন,তাহলে আমাকে বিশ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আরো বিশ লক্ষ ভাগ দিয়ে লাভের বাকি আশি লক্ষ টাকা আপনি নিবেন। এক পর্যায়ে লোভী লোককে নিয়ে ঢাকার প্রতারকের কাছে যাবে।

ঢাকার প্রতারক সুমিষ্ট হাসির মাঝে কথা বলে ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন করে বিদেশি প্রতারককে এনে ইংরেজ ভাষায় কথা বলে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত হলেও সে নিবে বলে মত দেন। এই ছলা কলা দেখে অধিক টাকা অবৈধভাবে লাভবান হইবে মনে করিয়া কাউকে না বলে নিজে চলমান বানিজ্য ঘাটতি করে পাওনাদারদের পাওনা নাদিয়ে আশি লক্ষ টাকা সংগ্রহ করার অভিযানে নেমে পড়ার পাশাপাশি অতি আনন্দ মনে মূর্তি দেখতে গেলেন। মূর্তি দেখে ছবি তুলেন।প্রতারকদের দলভুক্ত স্বর্ণকার দিয়ে কষ্টিপাথর সঠিক আছে মর্মে প্রমাণ দেন। আশি লক্ষ টাকা সহ গাড়ি যোগে অধিক রাতে প্রতারক চক্রের নিরাপত্তা বেষ্টিত নির্ধারিত স্থানে টাকা নিয়ে একটি সিমেন্ট পাথরের মূর্তি বুঝাইয়া দিয়া প্রতারক দলের পঞ্চম দল নকল পুলিশ এসে হাজির হতেই লোভী লোককে বলবে আপনি দ্রুত গাড়ি নিয়ে ঢাকার ঐ ঠিকানায় চলে যান। আমি অন্য ভাবে আসছি।

আপনার গাড়ি যদি এখন পুলিশ চেক করে তাহলে আম-ও-যাবে,ছালা-ও-যাবে। লোভী লোকটি সরল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে ঢাকার প্রতারক দলের ঠিকানায় গিয়ে দেখবে তালাবদ্ধ হয়ে আছে। টু-লেট লেখা। মোবাইল ফোন ও বন্ধ। বাড়ি এসে বস্তা খুলে দেখে যেই মূর্তি দেখাইছিল সেই মূর্তি এটা না। নিজেকে মদন ভেবে নিজের সাথে নিজেকে যুদ্ধ করে বসবাস করে আপন নীড়ে।

লজ্জায় দুঃখে অনেক সময় আজীবন রোগ-শোক সঙ্গে নিয়ে বসবাস করে। ভাইয়েরা আমার জেনে রাখুন যদি প্রকৃত একটি কষ্টিপাথরের মূর্তিও আপনাকে দেয় তাহলে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টুকরা করে স্বর্ণকারদের নিকট বিক্রি করলে প্রতি টুকরো সাড়ে তিনশত টাকা করে মোট বিক্রি হবে সাড়ে তিন লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ধর্মীয় পূজা করার জন্য শখের বসে কেউ এই মূর্তি অধিক দামে কিনতে চাইলেও আইন অনুযায়ী ক্রয় করার সুযোগ নেই। তাই আসুন আমরা সচেতন হই অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার লোভী লোক না হয়ে প্রতারক দলের সদস্যদের ছলা কলা অভিনয় সম্পর্কে একে অপরকে অবহিত করি।

প্রতারণার ফাঁদ: কষ্টি-পাথরের মূর্তি

 

লেখক:
সেলিম মিয়া
ইনচার্জ
ভোলাব তদন্ত কেন্দ্র

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম