Wed, 19 Sep, 2018
 
logo
 

আজও খুনিদের বিচার এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি

এম এ শাহীন: ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনে আগুনে পুড়ে ১১৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিল। এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সহস্রাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে, যার মধ্যে পঙ্গু হয়েছে দুই শতাধিক।প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষ গুলো পঙ্গুত্ব জীবন নিয়ে প্রতি মুহূর্ত যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।

তাজরিন অগ্নিকান্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনা আজও ভুলতে পারেনি স্বজন হারা পরিবার ও এদেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর মানুষেরা আজও চোখের জলে বুক ভাসায়।বাবা-মা হারা শিশুরা ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে, ক্ষুধার যন্ত্রনা নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। আবার কেও কেও জীবন বাঁচাতে হয়েছে শিশু শ্রমিক। বেঁচে থাকার তাগিদে গ্রাম থেকে আসা অসহায় দারিদ্র মানুষ গুলো তাজরিনে কাজ করতে গিয়ে মুনাফালোভী মালিকের লালসার আগুনে পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়েছে।হাজার হাজার শ্রমিক যখন বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করেছিল তখন মালিক গেইট খুলেনি। কারণ মালিকরা শ্রমিকদের মানুষই মনে করেনা তাদের কোন মানবতা নেই মুনাফাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।মানুষের জীবনের চেয়ে তাদের কাছে সম্পদের গুরুত্বই বেশী।মালিকরা মুনাফার লোভে মানব থেকে দানবে পরিণত হয়।তাজরিন, রানা প্লাজা, কেটিএস, স্পেকট্রাম, সারাকা গার্মেন্টস, মাইকো সোয়েটার, ট্যাম্পাকো, মাল্টি ফেবস-এ শ্রমিক হত্যাকান্ডের ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। যে শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানী করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে আজ তাদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, অকালে জীবন দিতে হচ্ছে তাদের। পোশাক শ্রমিকদের প্রতিটি মুহূর্ত যেন নিরাপত্তাহীনতা, শোষণ-নির্যাতন ও অসহায়ত্ব আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত খুনি মালিকদেরকে সরকার আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে রক্ষা করে চলেছে।আদৌ অপরাধীদের যথাযথ বিচার হবে কিনা তা নিয়ে শংকা রয়েছে।তাজরিন ও রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর দেশ বিদেশের মানবতাবাদী মানুষ সংগঠন ও ক্রেতা কম্পানী গুলো বর্তমান সরকারের প্রধান মন্ত্রীর বিশেষ সাহায্য তহবিলে শত কোটিরও অধিক টাকা জমা করেছিল কিন্তু আজ অবদি জাতীর সম্মুখে সেই টাকার হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।চিকিৎসার অভাবে এখনও অনেক শ্রমিক নিদারুন যন্ত্রনা নিয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।তাজরিন, রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর সারা বিশ্ব কেঁপে উঠলেও মালিক ও সরকারের টনক নড়েনি।মানুষের কান্না, দুঃখ-কষ্ট এসব তাদের কাছে তুচ্ছ।

তাজরিন অগ্নিকান্ডে শ্রমিক হত্যার  ৫ বছর পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পাইনি অথবা যা পেয়েছে তা যথার্থ নয়। আইএলও কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক মান অনুসারে তাদের  ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি । আহতদের চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়নি, যারা পঙ্গু হয়েছে তাদের পূর্ণবাসন করা হয়নি।তাজরিনের মালিক শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে অথচ তার অন্য কারখানা গুলো ঠিক মত'ই চলছে।তাজরিনের মালিক তার সম্পদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বীমা কম্পানী থেকে সে ২৩ কোটি টাকা আদায় করে নিয়েছে। মালিক ক্ষতিপূরণ পেলো ঠিক'ই কিন্তু স্বজন হারা অনেক অসহায় শ্রমিক পরিবার ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হলো। তাজরিন ও রানা প্লাজা হত্যাকান্ডের পর ক্ষতিপূরণ আইনের জোরালো দাবী উঠে ছিলো, আইএলও কনভেনশন অনুসারে আইন প্রণয়ন করতে হবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে বা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালে আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুসারে শ্রমিকের সারাজীবনের আয়ের সমপরিমান ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশ আইএলও'র সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দুর্ঘটনায় কোন শ্রমিক স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আর মৃত্যু হলে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে মর্মে আইন প্রণয়ন করা হলো। যা  আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের সাথে সামঞ্জস্য পুর্ণ নয়। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে'ই নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় আসে আবার কিছু দিন যেতেই তা চাপা পড়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে শিল্প কারখানা গুলোতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।দুর্ঘটনা রোধে কারখানার একাধিক বহির গমন সিড়ি, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা থাকে না।তাছাড়া মালিকদের উদাসিনতা, তদারকির অভাব ও গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।দেশে প্রচলিত শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিধান রয়েছে কিন্তু তাতে সরকার ও মালিকদের গাফিলতি এবং শ্রমিকদের অসেচতনতা রয়েছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে।তবে সে ক্ষেত্রে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শকগণের নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে অব্যাহত ভাবে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানিয়ে আসলেও কারখানার মালিক ও সরকার তা বিবেচনায় নেয়নি উল্টো  আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের উপর চালিছে নিষ্ঠুর নির্যাতন। দেশের সংবিধান অনুসারে সকল মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারেনা। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই সরকারকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। কেননা কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তাহীনতার ইস্যুতে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। শিল্পের স্বার্থেই শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সকল শ্রমিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে সুস্থ শ্রম শক্তি সৃজনের লক্ষ্যে প্রতিটি শিল্প এলাকায় আধুনিক হাসপাতাল নির্মান করা প্রয়োজন।শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হলে সুস্থ শ্রম শক্তি তৈরি হবে তাতে শিল্পের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।এতে পোশাক রপ্তানী বাড়বে শিল্প বিকশিত হবে দেশও  অর্থনৈতিক ভাবে আরো উন্নত হবে।

আজও খুনিদের বিচার এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি

লেখক: সভাপতি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম