Sun, 17 Jun, 2018
 
logo
 

রোহিঙ্গাদের সাথে একদিন

এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার: বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস, একটি বর্ণ্যাট্য ইতিহাস। দুঃক্ষে যাদের জীবন গড়া তারাই রোহিঙ্গা। জীবনে নিরাপত্তার স্বাদ তারা জন্ম থেকেই পায় নাই।

পুরুষানুক্রমে যুগ যুগ ধরে বসবাস করেও রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। জন্মসূত্রে নাগরিক হওয়ার যে আন্তর্জাতিক বিধান রয়েছে তা রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে জুটে নাই কোন দিন।

১৯৮৯ ইং সালের ১৮ই জুনের পূর্ব পর্যন্ত মিয়ানমার পূর্ব ইংরেজী নাম ছিল বার্মা। বৃটিশ শাসনামলে অং সান সুচির পিতা অং সান তার সাথীদের নিয়ে র্বামায় গড়ে ছিলেন “দোবামা আসিওনে” (আমাদের বার্মা) নামে একটি রাজনৈতিক দল। মায়ানমারে উগ্র বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল “নাডালা বাহিনী।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ ইং সালে অং সান জাপানের সাথে হাত মেলায় এবং গড়ে তোলে বর্মি জাতীয় সরকার। পরে ১৯৪৫ ইং সালের শুরুতে হাত মেলায় গ্রেট বৃটেনের সাথে। ১৯৪৭ সালে “দোবামা আসিওনে” দলের মধ্যে সৃষ্টি হয় গভীর ত্বাত্বিক মত বিরোধ। তাদেরই একটি অংশ আং সান ও তার সমর্থকদের হত্যা করে। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। বার্মার প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ-নু বৌদ্ধবাসী সমাজতন্ত্রের সুত্রপাত ঘটান। ১৯৬২ ইং সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপতি নে-উইন ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে গণতন্ত্র আলোর মুখ দেখে নাই। ১৯৭৪ ইং আরাকানের নাম বদলাইয়া রাখাইন রাখা হয়।

সম্প্রতিকালের ঘটনা ছাড়াও প্রতিনিয়তই রোহিঙ্গাদের উৎক্ষাৎ করা হয় বিভিন্ন অজুহাতে। অজুহাত যাহাই হউক না কেন এর মূল কারণ উগ্র বৌদ্ধত্ব বাদ। বৌদ্ধরা মুসলমানদের সহ্য করতে না পারার কারণেই সেখানে মুসলিম ও বৌদ্ধদের সহঅবস্থান চলেছে না যেমন সহবস্থানের উজ্জল দৃষ্টান্ত রয়েছে বাংলাদেশে।

৪/১১/২০১৭ ইং তারিখে রূপগঞ্জের প্রায় ৬০ জন সহকর্মী নিয়ে নিজেদের উদ্দ্যোগে সংগ্রহীত ত্রাণ নিয়ে উখিয়া উপজেলাধীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাই। দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাকর্মকতাদের অনুমতি নিয়েই কুতুপালং ৫নং ক্যাম্পে শরনার্থী রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলি। রাশিদং জেলার দোকান মালিক নুরুল ইসলাম জানান যে, তাদের গ্রামে ৪০০ লোকের বসবাস তন্মধ্যে ৭০ জনকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে যাদের এখনো খোজ পাওয়া যায় নাই। রাঙ্গাবালী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক আবুল হোসেন বলেন যে, রোহিঙ্গাদের পোড়াইয়া মারা হচ্ছে। সাহায্যের পরিবর্তে নাগরিকত্বই তাদের প্রধান দাবী বলে মন্তব্য করেন। নুরুসালাম এলাকার মোঃ ইলিয়াস জানান যে, তার পিতা/মাতাকে হত্যা করে পোড়াইয়া দিয়াছে। বালি বাজার এলাকার ৩০০০ জনের মধ্যে ২৫০০ জনই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আকাইব জেলার নেছাপুর গ্রামের শাহ আলম জানান যে, মিলিটারী মুসলমান রোহিঙ্গা দেখলেই গুলি করে হত্যা করে। ঐ জেলায় রাফাইলী এলাকায় সৈয়দ আলম জানান যে, রোহিঙ্গা মুসলমান দেখলেই দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া মিলিটারী গুলি করে এবং পিতা/মাতা স্বামীর সামনেই মহিলাদের ধর্ষণ করে। আকাইব জেলার ফকিরা বাজার এলাকার মীর্জা আহাদ জানায় যে, তার ভাইকে সহ তাদের গ্রামের প্রায় ১০০ জনকে মেলিটারীরা হত্যা করেছে। থামী এলাকার ইসলাম জানায় যে, হালচাষী তার ভাই নুরু আলমকে হত্যা করা হয়েছে। সাহেব বাজার এলাকায় হাজরা খাতুন জানায় যে, তার স্বামী ইলিয়াসকে হত্যা করার পর সে তার সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে এসেছে। এ ধরনের প্রায় শতাধিক পুরুষ, মহিলা, কিশোর, যুব-যুবতী রোহিঙ্গাদের সাথে নিবিড় ভাবে আলাপ করলাম। রোহিঙ্গাদের সকল ভাষা পরিষ্কার বুঝা না গেলেও তাদের আকুতিতে মনে হয় যে, তাদের বাচার একটি আন্তর্জাতিক অধিকার রয়েছে তা তারা উপলব্দি করতে পারছে না। তাদের সাথে আলোচনার সময় কমিনিউটি রেডিও নাফ ৯৯.২ এফ এম প্রতিনিধি (১) সাদ্দাম হোসেন এ্যানি, (২) হামিদা আখতার, (৩) রোজিনা আখতার, (৪) বিয়াসালউদ্দিন ভাষাগত সমস্যায় আমাকে সহযোগীতা করেন। ঘটনার বিবরণ দেয়ার সময় রোহিঙ্গাদের চোখে মুখে যে হ্নদয় বিদারক চিহ্ন ফুটে উঠেছে তাতে প্রতিয়মান হয় যে, মিয়ানমার বৌদ্ধরা সকল বর্বরতার রেকর্ড ভঙ্গ করে বর্বরতার শ্রেষ্ঠতা অর্জন করেছে।

রোহিঙ্গাদের সাথে দীর্ঘ সময় আলপ করে তাদের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে যা জানতে পারলাম তা খুবই কষ্ঠদায়ক। শুরু থেকেই তাদের সেখানে সিডিউল কাষ্ট হিসাবে ট্রিট করা হয়েছে। যেমন তাদের কোন আতœীয় স্বজন সরকারী কর্মকর্তা বা উচ্চ শিক্ষিত এমন কোন রেফারেন্স দিতে পারে নাই। বিশ্ব বিদ্যালয় পড়–য়া বা পাশ করা কোন ছাত্র/ছাত্রীর কথা জানতে পারলাম না। পেশা হিসাবে তারা চাষাবাদ ও খেটে খাওয়ার কাজ করে। তবে সেখানে মার্কেট, গার্মেন্টস প্রভৃতির মালিক রয়েছে বলে জানা যায়। কৃষকদের মধ্যে ধনী কৃষকও রয়েছে। তবে সাধারনতঃ দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে এমন সংখ্যাই বেশী।

একটি বাজারের ভিতরে সরুরাস্তা দিয়ে নিন্মঞ্চল থেকে উচু জায়গায় কুতপালং- ৫নং ক্যাম্পটি অবস্থিত। ক্যাম্পে অগনিত নর-নারী। ক্যাম্পে এখনো যাদের জায়গা হয় নাই তাদের স্থান হয়েছে রাস্তার দুই পার্শ্বে। পলিথিন দিয়ে তাদের আশ্রয় স্থল বানানো হয়েছে। ক্যাম্পের বাহিরে সরকারী ত্রাণ এখনো পৌছে নাই। গর্ভবর্তী মহিলাদের সংখ্যাই বেশী। গর্ভবর্তী হলে বৌদ্ধ মিলিটারী ধর্ষণ করে না এমন তথ্যও তাদের কথাবার্তা থেকে উঠে এসেছে।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের মধ্যে দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বের নাগরিকও বটে। কাহারো আন্তর্জাতিক অধিকার ক্ষুন্ন না হওয়ার জন্যই ১৯৪৫ ইং সনে ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘের জন্ম হয়। তবে যেহেতু আমেরিকা, গ্রেটবৃটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও চীনের যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে সেহেতু জাতিসংঘ বর্তমানে উক্ত ৫টি বৃহৎ শক্তির সেবা দাসে পরিনত হয়েছে। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) ও ভারত রোহিঙ্গাদের উপর বরবর অত্যাচারকে তারা সমর্থন দিচ্ছে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি প্রদেশের মধ্যে ৬টিই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। ভারত ও চীনের উল্লেখযোগ্য মুসলমান রয়েছে। তারপরও এ তিনটি রাষ্ট্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে খর্গহস্ত।    

রোহিঙ্গারা অধিকার নিয়ে বাচতে চায়, যা তাদের জন্মগত অধিকার। অধিকার অর্জনের জন্য পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেই বীর বাঙ্গালী স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। ভারতের সব সময় আগ্রাসনী ভূমিকা থাকলেও ১৯৭১ ইং সনে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা ছিল আমাদের জন্য সহায়ক। পাকিস্তানকে দ্বি-খন্ডিত করাই ছিল ভারতে স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ছিল অধিকার আদায়ের ও বাচা মরার লড়াই। দুই স্বার্থ যখন এক হয়েছে তখনই ভারত আমাদের মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি সামরিক সাহায্য দিয়েছে। সামরিক সাহায্য না পাওয়া গেলে এতো তাড়াতাড়ি দেশ স্বাধীন হতো কি না সন্দেহ (!) ধর্মীয় কারণে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল সে সৌদি আরব, এখন ত্রাণ দিয়েই খালাস। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব না নিয়ে সৌদি সরকার নিজেই বিশ্ব দরবারে তাদের গুরুত্ব হারাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইসলামিক কাউন্সিল একটি মাঝাভাঙ্গা সঙগঠনের পরিচয় দিচ্ছে। যার ফলে রোহিঙ্গাদের সমস্যা বিশ্ব দরবারে প্রকট আকার এখনো ধারন করে নাই। জাতি সংঘ যদি ঠুটো জগন্যাত না হতো তবে “শান্তি বাহিনী” পাঠিয়ে মিয়ানমার বর্বর মিলিটারীকে শায়েস্তা করা উচিৎ ছিল। মুসলমান হওয়ায় রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক বিশ্ব আজ অভিবাবকহীন যা মেনে নেয়া হ্নদয় বিদারক।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার বিষয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালচির এ প্রশ্নের জবাবে ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, “জীবন সময় বিপদে পরিপূর্ণ এবং আমি মনে করি না যে কারো বিপদ এড়ানো সম্ভব। যা সঠিক মনে হয় একজনের তাই করা উচিৎ এবং সেই যথার্থ কাজ করতে যদি বিপদ আসে তাহলে বিপদের ঝুকি অবশ্যই নিতে হবে। আমি পরিনতির কথা ভেবে কোন পদক্ষেপ নেই না।”


রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে যদি সাহায্য করতে হয় তবে সামরিক সাহায্যই হবে তাদের জন্য উত্তম সাহায্য যা একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে।
লেখক
কলামিষ্ট ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা   
মোবাঃ ০১৭১১-৫৬১৪৫৬
E-mail: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম