Mon, 18 Dec, 2017
 
logo
 

শ্রদ্ধা লও হে বীর শহীদ আজাদ

সীমান্ত প্রধান: শহীদ আজাদ একটি দেশ। শহীদ আজাদ একটি মানচিত্রের নাম। একটি লাল-সবুজের পতাকায় স্মৃতিগাঁথা অমর এক নাম। অথচ সেই আজাদের জন্মবার্ষিকী কিংবা মৃত্যু বার্ষিকী নীরবে আসে নীরবে চলে যায়।

আমরা ক’জন রাখি সে খবর? ক’জনই বা জানি শহীদ আজাদ ও তাঁর মা সম্পর্কে? আর জানলেই বা কতটুকো জানি?

কেউ কেউ হয় তো জানেন শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের কথা। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য, যারা জানেন, তাদের অনেকেই ভুলতে বসেছেন শহীদ আজাদের কথা। ভুলতে বসেছি এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য নিবেদিত প্রাণ শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের আত্মত্যাগের কথা। এই প্রজন্মের অনেকেই জানেন না আজকের এই স্বাধীন দেশটার জন্য শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের কতটা অবদান ছিলো। তবে সত্যি কথা বলতে কী, আমরা কিন্তু একদমই ভুলি না অমুকের ছেলে তুমকের ছেলের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন। তাদের নিয়ে কতোই না লম্ফঝম্ফ করি! অথচ এই অমুকের ছেলে তমুকের ছেলেরা এই দেশটাকে কী দিয়েছে?

ভয়াল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে এমন অনেক শহীদের মধ্যে অন্যতম  ছিলেন ‘শহীদ আজাদ’। ১১ই জুলাই সেই বীর শহীদ আজাদের ৭১ তম জন্মবার্ষিকী। এ খবর আমরা ক’জনই বা রেখেছি, রাষ্ট্র কী এই শহীদের জন্মবার্ষিকী পালনে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে?

ষাট দশক। আজাদ তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। অত্যন্ত ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলো সে। তাঁর পুরো নাম মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ। তার বিলাসী ধনী পিতা বিলাসিতার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এর প্রতিবাদ করেন আজাদের মা। প্র্রতিবাদ স্বরূপ অভিমানী মা ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন ওই বিশাল অট্টালিকা ছেড়ে।

সেদিনের পর থেকে ছোট্ট একটি ভাড়া করা ঘরই হয়ে উঠে আজাদ ও তাঁর মায়ের মাথা-গুজার ঠাঁই।সেখানেই বহু কষ্ট-যাতনায় শুরু হয় এ দু’টি প্রাণের দিনযাপন। তবে এতো কষ্টের মধ্যেও মায়ের একমাত্র লক্ষ্য ছিল যক্ষের ধন একমাত্র অবলম্বন আজাদকে মানুষ করা। আজাদকে মানুষ করার প্রাণান্তকর যুদ্ধ শুরু করেন মা। অবশেষে মায়ের চেষ্টা আর আজাদের একাগ্রতায় ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমএ পাশ করেন আজাদ। সেসময় আজাদের একমাত্র বন্ধু বা সঙ্গি ছিল তাঁর খালাতো ভাই ফেরদৌস আহমেদ জায়েদ।

১৯৭১ সাল। পুরো দেশ উত্তাল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নগ্ন হামলা মুক্তিকামী বাঙালির ওপর। একের পর এক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক। নৃশংসভাবে হত্যা করছে নিরস্ত্র-নিরপরাধ মানুষ। তখন এদেশের মুক্তিকামী মানুষ, ছাত্র-যুবক-কৃষক-জেলে-শ্রমিকেরা চুপ বসে থাকতে পারে নি। তাঁরা ঝাঁপিয়ে পরে নিজ নিজ অবস্থান থেকে। পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় মুক্তিকামী বাঙালি। শুরু হয় একটি লাল সবুজের পতাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধ।

আজাদ তখন সবেমাত্র পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন। দেশের এমন পরিস্থিতিতে সে-ও চুপ বসে থাকতে পারে নি। সে-ও মনঃস্থির করেন যুদ্ধে যাবে, তবে প্রয়োজন মায়ের অনুমতি। কেননা, মা ছাড়া তাঁর জীবনে আর কেউ নেই আবার তাঁকে ছাড়াও মায়ের কেউ নেই, তাই মায়ের অনুমতি ছাড়া তার পক্ষে কিছু করাও সম্ভব নয়। মাকে আজাদ বলল, ‘মা, আমি কী যুদ্ধে যেতে পারি’? প্রতিত্তোরে মা বললেন, ‘নিশ্চয়ই, তোমাকে আমার প্রয়োজনে মানুষ করিনি, দেশ ও দশের জন্যই তোমাকে মানুষ করা হয়েছে’। মায়ের অনুমতিক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদও ঝাঁপিয়ে পড়েন। সঙ্গে ছিলো বন্ধু শহীদ জননী জাহানারা ইমামপুত্র রুমি।

রাজধানীর ২৮ নাম্বার মগবাজারে ছিলো আজাদের বাসা। সেখানে ১৫ আগস্ট রুমী নিয়ে গেলেন তাঁর মা লেখক জাহানারা ইমামকে। সেখানে আজাদের মায়েরর সাথে দেখা হয়েছিল শহীদ জননীর। সেদিনকার আলোচনায় উঠে এসেছিলো, ২১ আগস্ট রুমী ও আজাদ মেলাঘরের ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে স্পেশাল ট্রেনিং নিবেন। তাদের মিশন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়ানো। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি গেরিলা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রুমি ও আজাদ।

১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। রাতে আজাদের মগবাজারের বাড়িতে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। গুলিতে আহত হন আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ। একই সময় ধরা পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সেসময় আজাদকেও আটক করা হয়। তাকে ধরে নিয়ে রাখা হলো রমনা থানা সংলগ্ন ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।

ছেলের সাথে দেখা করার জন্য রমনা থানায় ছুটে গিয়েছিলেন আজাদের মা। মাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আজাদ। মা জানতে চাইলেন ‘কেমন আছো’, আজাদ মাকে বললেন, ‘খুব মারে, ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি’। ছেলের সামনে তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। বরং ছেলেকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনো কিছু স্বীকার করবে না’।

সেদিন থানা হাজতে মায়ের কাছে আজাদ ভাত খেতে চেয়িছিলেন। আজাদ মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়ে বলেছিলেন, ‘মা কতদিন ভাত খাই না, আমার জন্য ভাত নিয়ে এসো’। মা ভাত নিয়ে ফের থানায় গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন ছেলে নেই। আজাদ আর কোনদিনও ফিরে আসে নি। ধরে নেওয়া হয় সেদিন-ই ঘাতকরা মেরে ফেলেছে মায়ের যাদুধন আদরের আজাদকে।

ছেলে একবেলা ভাত খেতে চেয়েছিলেন, মা পারেননি ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে। সেই কষ্ট-যাতনা থেকে পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তুলেন নি মা! তিনি অপেক্ষায় ছিলেন ১৪ টা বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। বিশ্বাস ছিলো তাঁর আজাদ ফিরবে। ছেলের অপেক্ষায় শুধু ভাতই নয়, ১৪বছর তিনি কোনো বিছানায় শোনওনি। ঘরের মেঝেতে শুয়েছেন শীত গ্রীষ্ম কোনো কিছুতেই তিনি পাল্টাননি তার এই পাষাণ শয্যা। এর মূল কারণ আজাদ রমনা থানায় আটককালে বিছানা পায়নি।

১৯৮৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ১৯৭১ সালের এই ৩০ আগস্টেই পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিলো আজাদকে। লেখক আনিসুল হক তাঁর ‘মা’ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন আজাদ ও তার মায়ের সেসব ঘটনা। যা পড়তে পড়তে পুরো দৃশ্যগুলোই ভেসে উঠে দৃষ্টিপটে। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে নামতে থাকে বাধ না মানা অশ্রুজল।

অথচ আমরা সেই শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের মর্মস্পর্শী আত্মত্যাগের কথা বা তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে নিজেরাও হতে পারছি না খাঁটি দেশপ্রেমিক। যার কারণে আমরা এখনো দু’হাত ভরে দেশ ও জাতীর ক্ষতি সাধন হওয়ার মতো অনেক কাজই করছি অবলীলায়। এর মূলে হচ্ছে আমাদের মধ্যে প্রকৃত দেশপ্রেমের অভাব। তবে আমাদের মধ্যে যেটুকু দেশপ্রেম আছে তা কেবলই পোশাকি। তবে শহীদ আজাদের ৭১ তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক, ‘আর নয় পোশাকি, দেশপ্রেম হোক অন্তরের’। শ্রদ্ধা লও হে বীর শহীদ আজাদ।

শ্রদ্ধা লও হে বীর শহীদ আজাদ

 

লেখক: হেড অব নিউজ লাইভ নারায়ণগঞ্জ

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম