Fri, 24 Nov, 2017
 
logo
 

আসল শাস্তি থেকে বেঁচে গেলেন শ্যামল কান্তি!!!

রবিন বিল্লাল: হরহামেশাই বিদ্যালয়ের নিজ শিক্ষকদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয় ছাত্র-ছাত্রীরা । শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষক কক্ষে, প্রশিক্ষণ মাঠে, প্রশিক্ষক কক্ষে, আবাস কক্ষে সর্বত্রই নির্যাতিত হচ্ছে।

বেত্রাঘাতের পাশাপাশি শিক্ষকরা হাতও চালান শিক্ষার্থীদের উপর। শিক্ষকের বিরাগভাজনের ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিষয়টি পরিবারের কাছে চেপে যায়। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে এধরনের নির্যাতন করছেন এক শ্রেণির শিক্ষক। এমনিভাবে গত ৮ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যানদীল পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাত হাসানকে নির্যাতন করেন তারই প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। যা হাইকোর্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমনভাবে রিফাত হাসানকে কিলঘুষি মেরে নির্যাতন করা হয় যার জন্য সুস্থ করতে ফার্মেসী থেকে ওষুধ এনে খাওয়াতে হয়েছে। এই রকম আচরন কী একজন প্রধান শিক্ষকের কাছে কাম্য?
২০১০ সালে চুরির অভিযোগে ১০ বছর বয়সী এক ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করেন এক শিক্ষক। সহপাঠীদের সামনে এ ঘটনায় অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে আত্মহত্যা করে ওই ছাত্র। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর পক্ষ থেকে ২০১০ সালের জুলাই মাসে হাইকের্টে একটি রিট আবেদন করেন। জনস্বার্থে করা এ রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির নামে শিক্ষার্থী নির্যাতন করা অবৈধ, অসাংবিধানিক, মৌলিক অধিকার পরিপন্থী বলে রায় দেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে সরকারি নীতিমালা ও পরিপত্র : ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এরপর শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে একটি নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ শিরোনামে জারিকৃত এই আদেশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- শারীরিক শাস্তি বলতে বুঝাবে যে কোন ধরনের দৈহিক আঘাত করা। যেমন- শিক্ষার্থীকে হাত পা বা কোন কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, চক বা ডাস্টার জাতীয় বস্তু ছুঁড়ে মারা, আছাড় দেয়া ও চিমটি কাটা, কামর দেয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেয়া, হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে পেন্সিল চাপা দিয়ে মোচড় দেয়া, ঘাড় ধাক্কা দেয়া, কান টানা বা ওঠা-বসা করানো, চেয়ার টেবিল বা কোনকিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করিয়ে বা শুইয়ে রাখা, কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করে রাখা, এবং ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে এমন কোন কাজ করানো যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আর মানসিক শাস্তি বলতে বুঝাবে- শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এমন কোন মন্তব্য করা যেমন: মা-বাবা, বংশ পরিচয়, গোত্র বর্ণ ও ধর্ম সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা, অশোভন অঙ্গভঙ্গি করা যা শিক্ষার্থীদের মনে বিরোপ প্রতিক্রিয়া সৃস্টি করতে পারে।
এ নীতিমালা সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসাসহ (আলিম পর্যন্ত) অন্য সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে। নীতিমালায় বলা হয়, কোন শিক্ষক-শিক্ষিক্ষা কিংবা শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত কোন ব্যক্তি অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারি পাঠদান কালে কিংবা অন্য কোন সময় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে উল্লিখিত শাস্তিযোগ্য আচরণ না করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এসব অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, তা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারি আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরোদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
তাহলে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাত হাসানকে মারধর করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আমার প্রশ্ন, যদি আপনার কোমলমতি শিশুসন্তানকে রিফাত হাসানের মতো এভাবে নির্যাতন করা হতো, আপনি কী স্বাভাবিকভাবে বিষয়টি মেনে নিতেন? যদি না হয় তাহলে আমরা শ্যামল কান্তির শাস্তি দাবি করছি না কেন?

 

লেখক- সাংবাদিক ও মানবাধীকার কর্মী

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম