Wed, 26 Jul, 2017
 
logo
 

মায়ের ভালবাসা কখনো ফুরোনোর নয়

বিশ্ব “মা” দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার। এবার ৮ই মে বিশ্ব মা দিবস পালিত হবে। মা ত্রিভূবনের সবচেয়ে মধুরতম অপার্থিক শব্দ। মা কথাটি ছোট্ট হলেও মা-ই বসুন্ধরা, মমতার আধার তার সহজাত মমত্ব দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন অসামান্য দরদে। সন্তানের রোগে- শোকে মাও আক্রান্ত থাকেন একই তম্বীতে।

আল্লাহ্ পাকের সেরা সৃষ্টি মায়ের মতো আপন কেউ নেই, কেউ হতেও পারে না। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্টভাবে ঘোষনা করেছেন মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। সবচেয়ে আপনজন মাকে সম্মান জানাতে বিশ্ব ব্যাপী পালিত হয় মা দিবস। বর্তমানে মা দিবস নিয়ে তেমনটা আর চোখে পড়ে কই ? ভালবাসা দিবসকে আমরা বলি বিশ্ব ভালবাসা দিবস। প্রায় গোটা পৃথিবীতেই একই দিনে পালিত হয় এই দিন। কিন্তু মা দিবসের বেলায় তা নয়। মা দিবস নিয়ে বহুভাগে বিভক্ত গোটা দুনিয়া। তবে কি গুরুত্ব আর মহিমায় ভালবাসা দিবস পেছনে ফেলে দেয় মা দিবস কে ? সুন্দর এ পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর শব্দ ‘মা’। একটি অক্ষরেই একটি শব্দ, এ হৃদয়স্পর্শী শব্দের সঙ্গে অন্য কোনো শব্দের তুলনা হয় না। মার সঙ্গে সন্তানের যে সম্পর্ক তা পৃথিবীর আর কোন সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তাই যুগে যুগে সারা পৃথিবীতে মা সবচেয়ে আপন জন। তার প্রমান মেলে পারস্য প্রচলিত একটি গল্প হল একটি ছেলে একটি মেয়েকে প্রচন্ড রকম ভালবাসে। বিয়ের পূর্বে মেয়েটি তাকে কেমন ভালবাসে তা পরীক্ষা করার জন্য বলল, তুমি যদি তোমার মায়ের হৃৎপিন্ড খুলে এনে আমার সামনে রাখতে পার তবেই আমি তোমাকে বিয়ে করব। এবার ছেলেটি বড় রকমের বিপদে পড়ে গেল। আনমনা ছেলেকে দেখে তার মা, তার কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে ছেলেটি তার মাকে ব্যাপারখানা খুলে বললে। মা ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে স্বেচ্ছায় তার হৃৎপিন্ড খুলে তার প্রেয়সীর সামনে হাজির করার অনুমতি দিল। ছেলেটি যখন তার মায়ের হৃৎপিন্ডটি নিয়ে দৌড়ে তার প্রেয়সীর কাছে যাচ্ছিল পথে হোঁচট খেয়ে যখন ছেলেটি পড়ে গেলে হাত থেকে মায়ের হৃৎপিন্ডটি বলে উঠল বাবা ব্যাথা পেয়েছিস। অতএব মায়ের বিকল্প কিছু নেই। পৃথিবীতে মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে- মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। মাকে নিয়ে প্রখ্যাত লেখক কবি সাহিত্যিক গীতিকার মাকে নিয়ে লিখেছেন হাজারো গল্প, কবিতা, ছড়া ও গান। হৃদয়পটে মমতাময়ী মায়ের স্মৃতি ভেসে উঠলেই মনে পড়ে যায়-
মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রিভুবনে নাই।
ছোট্ট বেলায় পড়া এ কবিতাটি বাস্তব জীবনে প্রত্যেক মানুষের মনের কথা। কারণ আমরা সবাই কোন না কোন মায়ের সন্তান, মা শব্দটির মধ্যে যে সুধা লুকিয়ে আছে, কী জাদু জড়িয়ে আছে লিখে বা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। ‘মা’ ডাকের মধ্যে কী যে পরিতৃপ্তির সুখ, অনাবিল আনন্দ তা অন্য কিছুতেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কত কষ্ট, কত না যন্ত্রনা সহ্য করে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে মা তার    সন্তানকে জন্ম দেয়। কত ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে মা তার সন্তানকে নিজের শরীরে রক্ত বিন্দু দিয়ে তিলতিল করে বড় করে তোলেন। মা কখনও নিজের সুখের চিন্তা করেন না। সন্তানের সুখই মায়ের বড় সুখ। মায়ের ভালবাসায় কোন স্বার্থ নেই। কোন প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। মায়ের মমতার আঁচল     সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মা সম্পর্কে লিখতে গেলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এমন দরদি মাকেও আমরা বড় হয়ে কথায় কথায় কষ্ট দেই। খারাপ আচরন করি। সন্তানের জন্য মায়ের অবদানের কথা লিখে ব্যক্ত করার মত উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নেই। মা এমন এক মহৎ প্রাণ যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে ও সন্তানের জীবন মঙ্গল কামনা করেন। নিজের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অক্ষত অবস্থায় বুকের ধনকে উদ্ধার করেন- এই কাহিনী পত্রিকার মাধ্যমে অনেকেই জানি। কারন এটা কোন নাটক বা সিনেমার গল্প নয়। এটা বাস্তব ঘটনা। এরকম জীবন বাজি রেখে সন্তানকে রক্ষা করতে কে বল মা-ই পারেন। মায়ের ঋণ কখনও শোধ করা যাবে না। তাই আমাদের প্রত্যেকের মাকে ভালবাসা উচিত যেমন ভালবাসা দিয়ে তারা আমাদের মানুষ করেছেন। বৃদ্ধ বয়সে মাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এটা খুব দুঃখজনক এবং অন্যায়। সব সন্তানকেই মায়ের প্রতি যতœবান হওয়া উচিত। সর্ববহুল উচ্চারিত মা শব্দটি ভালবাসার মতোই সব ভাষায় ছড়িয়ে গেছে ‘ম’ ধ্বনি মাধ্যমে। প্রতি বছরই মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার সারা বিশ্বে ‘মা’ দিবস পালিত হয় মাকে বিশেষ ভাবে স্মরণ করার জন্য। মূলত মাকে মনে করার জন্য নির্দিষ্ট কোন বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই। রংতুলির পরশ ছাড়াই সবার মনে আঁকা হয়ে যায় মায়ের ছবি। প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তই সিক্ত হতে পারে মায়ের ভালবাসায়। আদরিনী মাকে গভীর ভাবে উপলদ্ধি করতে এ দিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই দিনে শুধু নিজের মাকেই নয়, সারা বিশ্বের সব মাকে বিনম্রচিত্তে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। অনেক দেশে এই দিনে সাধারণ ছুটি থাকে। ১৮৭০ সালে আমেরিকায় ‘মা’ দিবস পালনের উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়। তখন সেখানে সিভিল ওয়ার চলছিল। সেখানকার সোশ্যাল অ্যাকভিক্ট জুরিয়া ওয়ার্ড হাউই’ তার একটি রেখায় ‘মা’ দিবসের প্রস্তাব দেন। তার মহৎ উদ্দেশ্যে ছিল মায়ের ভালবাসা আর ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের কবল থেকে মানব জাতিকে মুক্তি দেওয়া। অথচ জুলিয়া ওয়ার্ড হাউই ‘মা’ দিবস পালনের স্বীকৃতি পাননি। আনা জারভিস এরপর চেষ্টা করেন। ১৮৫৮ সালে তিনি অনুপ্রেরণা লাভ করেন তার মা আনা রিভজার ভিসের মাদারস ওয়ার্কডে পালন ধারনা থেকে। ১৯০৮ সালে তিনি তার মায়ের কর্মস্থল ওয়েষ্ট ভার্সিনিয়ার গ্রাশটনের একটি মেথডিষ্ট চার্চে প্রথম মা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহন করেন। তখন থেকে মে মাসের ১০ তারিখে আনা রিভজার ভিসনে মৃত্যু দিন বেসরকারি পর্যায়ে মা দিবস হিসেবে উদ্যাপন করা হতো। তারপর ১৯১৪ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ৯ মে প্রথম রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘ন্যাশনাল মাদার ডে’ ঘোষনা করেন। ব্রিটেনে ষোড়শ শতকে গির্জা কেন্দ্রিক ‘মা দিবস’ পালনের প্রথা প্রচলিত ছিল। তারপর থেকে প্রতি বছর মে মাসের চতুর্থ রোববার মাদার সানডে পালন করা হত। ওই দিন ব্রিটিশরা নিজ নিজ মায়ের প্রতি গভীর ভালাবাসা ও শ্রদ্ধা জানাত। দিনটির অন্যতম কর্মসূচির মধ্যে ছিল মায়ের জন্য উপহার কেনা এবং মাকে সময় দেওয়া। বর্তশানে সারা বিশ্বেই বেশ উৎসাহের সঙ্গে ‘মা’ দিবস পালন করা হয়। ১৯১২ সালে আনা জারভিসকে ‘মাদার ডে’ প্রবর্তক হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এভাবেই মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘মা’ দিবস পালিত হয়ে আসছে। ইউরোপীয় চেতনায় গুল্ডহোম বা বৃদ্ধাশ্রমে মাকে ফেলে রেখে বছরে একদিন এসে গিফ্ট বা উপহার দিয়ে যাওয়ার যে নিয়ম চালু হয়েছে, সে প্রথা আমরা ভেঙ্গে দিতে চাই। অনেক ভালবাসা সঙ্গে হয়তো ভালবাসা, বাড়ি, গাড়ি বংশমর্যাদা কিংবা দামি উপহারের ব্যাপার-স্যাপার জড়িয়ে থাকে। অনেক ভালবাসাই হয়তো শেষতক ঘৃনা আর বিদ্বেষে গিয়ে রূপ নেয়, কিন্তু মায়ের ভালবাসা কখনো ফুরোনোর নয়। মা কখন ঐ গিফ্ট চান না। আমরা চাই প্রতিদিন হোক ‘মা’ দিবস সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহশীষ আর ভালবাসায় ভরে উঠুক পৃথিবী। সন্তান থাকার পরও বৃদ্ধ বয়সে যেন ‘মা’ কে যেতে না হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এই শুভকামনাই হোক প্রতিটি মা দিবসের দীপ্ত শপথ।

লেখক: জাহাঙ্গীর ডালিম (সাংবাদিক-কবি)

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪