Mon, 17 Dec, 2018
 
logo
 

না.গঞ্জে শিক্ষা ব্যববস্থায় দুর্ণীতি-অনিয়ম-বাণিজ্যে ক্ষুব্ধ অভিভাবক, নীরব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ

লাইভ নারায়ণগঞ্জ : শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকারও শিক্ষার ওপর বেশ গুরুত্বারোপ করেছেন। তারপরও নারায়ণগঞ্জে শিক্ষা ব্যবস্থাটা দিনদিন ব্যবসায় পরিণিত হচ্ছে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয়ে চলছে ব্যাপক বাণিজ্য। প্রায় সময় তাদের বিরুদ্ধে দুর্ণীতি অনিয়মসহ নানা অভিযোগ ওঠে আসছে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও রাজপথে নেমে আন্দোলন করছে।

দীর্ঘদিন ধরেই জেলার বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি, কোচিংসহ গাইড ও বই বাণিজ্য নিয়ে অভিাবক মহল থেকে অভিযোগ উঠে আসলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বরাবরই ছিলেন নীরব। আর এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনোভাবেই অনিয়ম দুর্ণীতি দূর করা সম্ভব হচ্ছে। এ সুযোগে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা থেকে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বার একাডেমির প্রধান শিক্ষক এএইচএম মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে দুর্ণীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও গাইড বই পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবাদ করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।  

এদিকে নগরীর নারায়ণগঞ্জ গার্লস কলেজ এন্ড স্কুলে বাধ্যতামূলক কোচিং সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ ছিল কোনো শিক্ষার্থী কোচিং করুক আর না করুক তাকে প্রতি মাসে কোচিং ফি বাবদ ৫ শ‘ টাকা করে দিতেই হবে।

২ এপ্রিল ছিল প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। ছাত্রীরা যথারীতি পরীক্ষা দিতে আসেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু ছাত্রীকে পরীক্ষা দিতে দিচ্ছিলেন না কোচিং ফি না দেয়ার কারণে। এ নিয়ে শুরু হয় হৈ চৈ হট্টগোল। আর এসব কিছুই ঘটছিল নগরীর শিক্ষানুরাগী (বাস্তবতায় শিক্ষাকে ব্যবসায় রূপান্তরিক করার মূল কারিগর) কাশেম জামাল। তিনি এসব দেখেও কোনো প্রতিবাদ করছিলেন না। খবর পেয়ে সাংবাদিকরা জড়ো হন।

এ খবরে স্কুলটিতে ছুটে এসেছিলেন এডিসি (শিক্ষা ও আইসটি) মো. ছরোয়ার হোসেন। তিনি সকল শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অভিযোগ শুনেন এবং তাদের পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন। সেই সাথে সাংবাদিকদেরকে আশ্বস্ত করেন এ ঘটনার ব্যাপারে ব্যস্থা গ্রহণ করবেন।

শুধু আমলা পাড়া গার্র্লস কলেজই নয়। নগরীর অসংখ্য স্কুলেই এরকম বাধ্যতামূলক কোচিং ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাকে পুঁজি করে আর শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে প্রতি মাসেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্কুলগুলোর পরিচালনা পর্ষদ।

এরমধ্যে কিছুদিন আগেও বিবি মরিয়ম স্কুলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠে। এ অভিযোগের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে লাইভ নারায়ণগঞ্জ সহ স্থানীয় বেশ কটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশও হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। যার কারণে ওই স্কুলটিতে এখনও বাধ্যতা মূলক কোচিং ব্যবস্থা চালু আছে।

এর আগেও ২০১৬ সালের ২ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাইনদী নতুন মহল্লায় হাজী সামসুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসেন আহামেদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের অভিযোগ ছিলো এই শিক্ষকের মানসিক অত্যাচারের কারণে স্কুলটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মুয়াজ আহমেদ স্কুল ছেড়ে চলে যান।  

একই বছরের ১৯ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জে মিজমিজি বাতানপাড়া এলাকার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সার্টিফিকেট বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়ব প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সরকারি নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে দেড়শ টাকা করে হাতিয়ে নিয়ে সার্টিফিকেট প্রদান করেন।

একই বছরের ২৫ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলীর নারায়ণগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সমীর কর্মকার ও তার স্ত্রী ময়না রাণীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম দুর্ণীতির অভিযোগ ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের বরাবরও অভিযোগ দাখিল করা হয়েছিলো। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেছিলো ২০১৭ সালের ৩০জন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করতে দিচ্ছিলেন না।  

একই বছরের ৩ নভেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় শেখ মোরতোজা আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বিবি মরিয়ম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক কেচিং বাণিজ্য চলছে অনেকদিন ধরেই। কেউ কোচিং করতে না চাইলে তার প্রতি শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দন কোচিংয়ের কথা স্বীকার করলেও তা বাধ্যতামূলক নয় বলে দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রেজাল্ট ভালো করার জন্য কোচিং ব্যবস্থা। তার সাথে সুর মিলিয়ে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক সফিউল আলম খানও বলেছিলেন, যে সকল ছাত্রছাত্রী পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য কোচিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আমলা পাড়া গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক শীতল ছন্দ্র দে এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ ওঠছে। দুর্ণীতি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে তিনি নগরবাসীর কাছে ব্যাপক পরিচিত। প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমানের স্বক্ষর জাল করার অপরাধে একবার জেলেও যেতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে। এই শিক্ষককে বাঁচাতে স্কুলের ছাত্রীদের পথে নামতে বাধ্য করেন শীতল।

এদিকে প্রশ্ন ওঠেছে, স্কুলের মধ্যে বাধ্যতামূলক কোচিং বাণিজ্য কার স্বার্থে? সরকারি কোনো নিয়ম না থাকার পরও তারা কিভাবে কোচিং বাধ্যতামূলক করছে? আর শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যে টাকা নেয়া হচ্ছে, তা কার পকেট যাচ্ছে বা এর মাধ্যমে কাদের স্বার্থর রক্ষা করা হচ্ছে?

যেসব স্কুলে বাধ্যতামূলক কোচিং ব্যবস্থা চালু আছে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন অভিভাবক মহল। শিক্ষাকে পুঁজি করে আর শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যারা ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছেন তারা।

অভিভাবক মহলের দাবি এসব শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করার দায়দায়িত্ব যেসব সংশ্লিষ্ট বিভাগই এ ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যার কারণে জেলাজুড়েই শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি ব্যাপক বাণিজ্যে মেতে ওঠেছে। এসব দুর্ণীতি অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবক মহল।

 

এ সংক্রান্ত নিউজ পড়তে ক্লিক করুণ:

শিক্ষা বাণিজ্যের অভিযোগে বার একাডেমিতে অভিভাবকদের বিক্ষোভ

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম