Mon, 27 Mar, 2017
 
logo
 

আড়াইহাজারে সরকারী হাসপাতালে ঔষুধ প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ট রোগীরা

নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজার উপজেলার সরকারী হাসপাতালে বিভিন্ন খ্যাত অখ্যাত ওষুধ কোম্পানী গুলো প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য আশংকাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালে ও ডাক্তারের চেম্বারসহ সর্বত্রই তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে।

ডাক্তারের চেম্বার হতে রোগীরা বাহির হলেই চিকিৎসাপত্র নিয়ে টানাটানি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। অখ্যাত কোম্পানীর ওষুধ প্রতিনিধিদের এ দৌরাত্ম্যে অতিষ্ট চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। বেশী লাভের আশায় চিকিৎসকরাও যেন এসব কোম্পানীর প্রতিনিধিদের খুশি করতে প্রয়োজন ছাড়াই অখ্যাত কোম্পানীর ওষুধ লেখে দেন চিকিৎসাপত্রে।

হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সেবা নিতে আসা রোগিদের চেয়ে ওষুধ প্রতিনিধিদের পেছনে সময় ব্যয় করার কারণে উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠি সু-চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নারায়নগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলাবাসীর একমাত্র হাসপাতালে একজন মুমুর্ষ রোগী চিকিৎসার জন্য গেলেও ওষুধ প্রতিনিধি ও দালালের কবলে পড়তে হয়। ঔষধ প্রতিনিধিদের জন্য সরকার কর্তৃক সময় নির্ধারিত থাকলেও ডাক্তার ও ওষুধ প্রতিনিধি কেউই মানছেন না। বরং আবাসিক মেডিকেল অফিসার হাবিব ইসমাইল ওষুধ প্রতিনিধি ও দালালদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন তার চেম্বারে রোগী সংগ্রহাকারী চক্র।

একটি সূত্র জানায়, হাসপাতালের পাশে তার শ্বশুর বাড়ী, প্রভাবশালী এক নেতার বোন জামাতা,তিনি সময় মতো অফিসে থাকেন না, নিজের মতো করে অফিস করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, এ ব্যপারে গত রোববার টি এইচ শরিফ হোসেন খান তাকে সর্তক করে দেন। তার জন্ম স্থান কুমিল্লাতে হলেও আড়াইহাজারের শ্বশুর বাড়ীর লোকজনের ক্ষমতায়  বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন হাবিব ইসমাইল। হাসপাতালকে তার নিয়ন্ত্রনে রেখেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের পূর্ব কান্দী গ্রামের জমিলা খাতুন জানান, কিছু দিন আগে আমি নাকের পলি পাইলস আক্রান্ত হয়ে সরকারী হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে এক জন মহিলা নিয়ে যায় ২য় তলায় ডাক্তার হাবিব ইসমাইল এর চেম্বারে। উনার কাছ থেকে আমি ২শ টাকা ভিজিট দিয়ে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করি। কিন্তু উনি ব্যবস্থাপত্রে অযথা টেস্ট ও ঔষধ জুড়ে দেন। আমি ডাক্তার হাবিবের ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ সেবন করার পর আমার অবস্থা আরও অবনতি হতে থাকে। পরে  প্রাইভেট হাসপাতাল ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নেই । তিনি আরও জানান, অযথা ওষুধ সেবন করার কারণে তার এ সমস্য হয়েছে বলে উক্ত হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন।

গোপালদী গ্রামের ফরিদ উদ্দিন নামের একজন রোগী জানান,অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে কোন ডাক্তার পাইনি। পরে এক মহিলা আমাকে ডাক্তার হাবিব ইসমাইলের চেম্বারে নিয়ে যান। পরে আমাকে বাধ্য হয়েই ২শ টাকা ভিজিট দিতে হয়। অফিস চলাকালীন সময়ে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা চিকিৎসার বদলে ২শ টাকা ভিজিট দিয়ে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।    

পুরিন্দা টেক পাড়া গ্রামের মোহাজ্জেম বলেন, খালাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া মাত্রই একজন লোক আমাকে হাসপাতালে ২য় তলায় ডাক্তারের চেম্বারে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে শুরু করে। কিন্তু আমি তার কথায় সাড়া না দিয়ে হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে জররী বিভাগে কোন ডাক্তার পাইনি। দেখি জররী বিভাগে ওয়ার্ড বয় গাফ্ফার নামের এক ব্যক্তি রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। আমার রোগী বেশী অসুস্থ হওয়ায় পরে বাধ্য হয়ে ঐ লোকের কথায় ২য় তলায় ডাক্তার হাবিব ইসমাইলের চেম্বারে নিয়ে যাই। সেখানে দেখি ওই চিকিৎসকের সঙ্গেই বসে খোশ গল্পে মেঁতে রয়েছেন ভিবন্ন ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা। ডাক্তার কোন কোম্পানীর ঔষধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখবেন তা নিয়েও শুরু হয় তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি, আমি ২শ টাকা ভিজিট দিয়ে আমার খালাকে দেখালাম, চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসা মাত্রই আবারো বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা ব্যবস্থাপত্র দেখানোর জন্য টানাটানি শুরুকরে। কিন্তু আমার রোগীর অবস্থা খারাপ সেটা তারা বুঝতেই চায় না। প্রতিটা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলে রাখেন।

ওষুধ কোম্পানীগুলোর মধ্যে মার্কেটিং প্রমোশনের নামে প্রতিদিন চলছে অসুস্থ বাণিজ্যর প্রতিযোগিতা। ছোট বড় প্রায় সব কোম্পানী নিজ প্রতিষ্ঠানের ওষুধ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে মার্কেটিং প্রমোশনের নামে ডাক্তারদের পিছনে স্থানীয় প্রতিনিধি লাগিয়ে রেখেছেন, রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোন কোম্পানী ঔষধ লেখেছেন ডাক্তার। ব্যবস্থাপত্র দেখানোকে কেন্দ্র করে  অনেকরোগীর স্বজন ঔষধ প্রতিনিধিদের হাতে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায়ও ঘটে।

একটি সূত্র জানায়, ঔষধ প্রতিনিধিদের চাকরির পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকার ওষুধ বিক্রি করতে বাধ্যতামূলক টার্গেট রয়েছে কোম্পানিগুলোর। এ কারণে বিক্রয় প্রতিনিধিরা চাকরি বাঁচাতে টার্গেট পূরণ করতে নানা ছলচাতুরি ও প্রলোভন দেখিয়ে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় সব রকমের ওষুধ ডাক্তার ম্যানেজ করে বিক্রি করছে। ওষুধ প্রতিনিধিরা টার্গেট পূরণ করতে ডাক্তার ও প্রতিষ্ঠান ভেদে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে কলম, প্যাড, চাবির রিং থেকে শুরু করে নগদ অর্থ, টিভি-ফ্রিজ, আসবারপত্র সরবরাহও করে থাকে।

নাম না প্রকাশের শর্তে উক্ত হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, হাসপাতালের জনৈক এক ডাক্তারের ছত্রছায়ায় অনেক কিছু হয়। ডাক্তার স্থানীয় জামাতা হওয়ায় তার প্রভাবের কাছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অসহায়। ওষুধ কোম্পানি গুলোর আগ্রাসী মার্কেটিং নীতির ফলে দেশে অপ্রয়োজনীয় ঔষধের ব্যবহার বেড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ওষুধ বাজারজাতকরণ নীতিমালা থাকলেও তা কেউই মানে না। ফলে অসাধু ও অর্থলোভী ডাক্তার, হাতুড়ে ডাক্তার ও ফার্মাসিষ্টদের ফাঁদে পড়ে অশিক্ষিত ও দরিদ্র রোগীরা ভেজাল ও নি¤œমানের ঔষধ সেবন করে প্রতারিত হচ্ছে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শরিফ হোসেন খান বলেন, এ উপজেলায় ঔষুধ প্রতিনিধিদের একটি সংগঠন রয়েছে। তাদের সাথে আলোচনা করে হাপাতাল এর পক্ষ থেকে ডাক্তারদের সাথে দেখা করার সময় নির্ধারন করা হয়েছে সকাল ১০টা পর্যন্ত। যদি বিশেষ কোন প্রায়োজনে প্রতিনিধি ডাক্তারদের সাথে দেখা করতে চায়, তাহলে দুপুর ১টার পর। এক প্রশ্নের উঃ বলেন, অফিস চলা সময় সরকারী কোন ডাক্তার কোন রোগীর কাছ থেকে ভিজিট নেওয়া রাইট নয়। যদি এমন কোন ঘটনা এ হাসপাতালে ঘটে থাকে প্রমান সহকারে উর্দ্দতন কতৃপক্ষকে অভিহিত করা হবে।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪