Mon, 19 Nov, 2018
 
logo
 

‘ঘর সামলানোর সাথে ব্যবসাক্ষেত্রে অবদান রাখছে নারী’

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: টেবিলে একগাদা ফাইল। একের পর এক ফাইল দেখতে হচ্ছে তাকে। ভীষণ ব্যস্ততা। আর ক্ষণে ক্ষণে তো ফোন, টেক্সট আসছেই। যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই তার। এসব ব্যস্ততা একদিকে রেখে কিছুক্ষণের জন্য সময় দেন আমাদেরকে। বলছি ক্রোনী গ্রুপের চেয়ারম্যান নীলা হোসনে আরা’র কথা। পঁচিশ বছর ধরে তিনি এই গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। কথায় আছে যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন।

অর্থাৎ একজন নারী যেমন ঘর-সংসারে মনোযোগী হতে পারে সেই সঙ্গে সে তার অন্যান্য কাজেও পারদর্শী। একটি সময় ভাবা হতো একজন নারী শুধু সংসার সামলাবে। তবে আধুনিক যুগের নারীরা সংসার সামলানোর পাশাপাশি ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।

দুরন্ত ছোটবেলা কাটিয়েছেন। কিছুটা টমবয়ের মতো। স্কুল শেষ করে কলেজ পাড়ি না দিতেই বিয়ে হয়ে যায় তার। তারপরও মনোযোগ দিয়ে চালিয়ে যান পড়াশোনাটা। নারায়ণগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করলেও ইংরেজিতে বেশ দক্ষ হওয়ার ফলে ডিগ্রি করে তার মন ভরেনি, তখন আমেরিকা ইন্টারন্যাশনালে বিবিএ কমপ্লিট করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর যখন সবাই চাকরির স্বপ্ন দেখে তেমনই এর ব্যতিক্রম ছিল না নীলার। এমন ইচ্ছের পর তার বর নিজেই প্রস্তাব করেন তাদের ব্যবসা দেখার জন্য। এর থেকেই আর পিছনে ফিরে তাকাননি তিনি। ব্যবসায়িক মায়ের মেয়ে বলে কথা! তিনি মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান হিসেবেও গর্ব করেন।

 

প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাওয়ায় নীলা বলেন, ‘আমি যখন জয়েন করি তখন ফ্যাক্টরির অবস্থা এখনকার মতো ছিল না। জয়েনের প্রথমে অফিসের কারো কাছ থেকে তেমন সাধুবাদ পেলাম না। অনেকেই বলাবলি করছিল, এই মহিলা কেন আসে, উনি কি বুঝে, উনি কেন ঘুরাঘুরি করে, উনার কি কাজ এখানে? এমন নানান কথা তার কানে আসতে শুরু করে। তখন তিনি সবাইকে স্রেফ বলে দিয়েছিলেন, এতদিন আমি মেহমান হিসেবে আসতাম এখন ডিরেক্টর হিসেবে আসছি। এবং এখন থেকে আমি সবকিছু দেখভাল করব। এখন আমি অনেক কিছু বুঝি না, জানি না। তবে আমি ধীরে ধীরে সব বুঝে নিব, শিখে নিব।’ এ ভাবেই নিজের প্রতিষ্ঠানে নিজের জায়গা তৈরি করে আজকে সফল নারী হিসেবে পরিচিত নীলা। ক্রোনী গ্রুপের প্রায় দশটি প্রতিষ্ঠানে দেখাশোনা করেন তিনি।

 

গার্মেন্টস শিল্পে নারীদের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে নিম্ন এবং উপরের স্তরের মেয়েদের অবস্থান রয়েছে কিন্তু মধ্য স্তরে তাদের অবস্থান নেই ফলে নারী শ্রমিকরা তাদের দাবি-দাওয়াগুলো বলতে পারে না। আমরা যারা এসব নিয়ে কাজ করি তাদেরকে ওই দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে নীলার বক্তব্য, মেয়েদের এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন সমাজে অবস্থান এবং আৎমমর্যাদা চায়। কয়েক বছর আগেও এসবের কিছুই ছিল না বাংলাদেশে। এখন নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মিলছে, যা একজন নারীর মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য খুবই গুরুৎবপূর্ণ। আমি ছোটবেলা থেকেই নাচ, গান করে বড় হয়েছি, সেই সুযোগটি আমি পেয়েছি। কিন্তু সেটা সবাই পায় না। আমার মা আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন এই কারণেই আজকে আমরা এই জায়গায় এসেছি। আমার মাও কিন্তু ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি প্রচণ্ড সাহসীও ছিলেন কিন্তু তার পড়াশোনা বেশি ছিল না, তবে যা ছিল তা হলো মনোবল। নারী হিসেবে ব্যবসা করতে গেলে, কোনোকিছু মোকাবিলা করতে গেলে যে বিষয়টা সামনে আসে, তা হচ্ছে আউটলুক বা বাইরের সৌন্দর্য। এটা খুবই বিরক্তিকর। আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে কাজ করব, সেখানে বাইরের সৌন্দর্য দিয়ে কি হবে। আমার কাছে মনে হয় আমি যখন কাজ করতে যাব, আমি নারী হিসেবে নয়, আমি একজন মানুষ হিসেবে কাজ করতে যাব। একজন নারী কাজ করতে গেলে নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসবে, নানান জন নানান কথা বলবে, এসব কিছুই কানে নেওয়া যাবে না। নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের প্রথম প্রতিবন্ধকতা তার পরিবার। পরিবার তাকে সপোর্ট দেয় না। তবে নারী উদ্যোক্তাদের আরও যে প্রতিবন্ধকতা কাজ করে, তারা ব্যাংক থেকে লোন পায় না, যাদেরকে লোন দেওয়ার দরকার তারা শুধু গ্র্যান্টারের অভাবে লোন পায় না। আবার যাদের দরকার নেই তাদেরকে লোন দিতে বসে থাকে। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নানান পদক্ষেপ নিলেও নানান কারণে নারীরা এর পুরোপুরি সুফল পায় না।’

 

নীলা তার প্রতিষ্ঠান দেখার পাশাপাশি নানান সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। এর বাইরেও নিজ উদ্যোগে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যান। এর মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ে এবং পড়াশোনা করে অনেকে চাকরিও করছে। তিনি একসময়ে লায়ন’স কন্ডিশন চেয়ারম্যান ছিলেন।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম