Mon, 23 Oct, 2017
 
logo
 

আলোচিত ত্বকী খুন ও পারভেজ গুমের রহস্য আজও অধরা

লাইভ নারায়ণগঞ্জ : একে একে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত শুরু হচ্ছে না নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মাহমুদ ত্বকী হত্যার। এমনকী এই হত্যার নেপথ্যে কারা ছিলো সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো সুরাহ হচ্ছে না। প্রশাসনও ঢিমেতাল নীতি অনুরসরণ করে চলছে।


অপরদিকে ত্বকী হত্যায় যখন গোটা দেশসহ উত্তাল নারায়ণগঞ্জ তখনই  নিখোঁজ হয় যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ। ওসমান পরিবারের ক্যাডার হিসেবে  পরিচিত পারভেজের ভাগ্যে কী ঘটেছে (?) তা জানে না অনেকেই।

তবে নারায়ণগঞ্জের সুধী মহল মনে করছেন, ত্বকী হত্যায় সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করে আইনের  আওতায় আনা যেমন দরকার, তেমনিভাবে পারভেজ গুমের রহস্যও উদঘাটন হওয়া জরুরী। আর  এ ব্যাপারে আইন প্রশাসনকেই সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো রকম রাজনীতিক বিবেচনায় রহস্য উদঘাটন না করে অথবা এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত অপরাধীদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তা না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। সৃষ্টি হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি সৃষ্টি মানেই নতুন নতুন অপরাধ সৃষ্টিতে উৎসাহ যুগাবে।

সূত্র বলছে,  ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হয় তানভীন মাহমুদ ত্বকী। ৮ মার্চ তার মৃতদেহ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যায়। এ ঘটনায় ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বিসহ নগরীর সুধী সমাজ ওসমান পরিবারকেই অভিযুক্ত করে আসছিলো। প্রকাশ্যেই দাবি করা হয়েছিলো এই খুনের নেপথ্যে ওসমান পরিবার সম্পৃক্ত।

এ ঘটনায় ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, যুবলীগ নেতা পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাতকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে একটি অবগতিপত্র দেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি।

এছাড়া ২০১৩ সালের ৭ অগাস্ট শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরি ওসমানের কার্যালয়ে র‌্যাব-১১ এক অভিযান চালিয়ে একটি রক্তমাখা প্যান্টসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র উদ্ধার করে র‌্যাব। সেখানেই ত্বকীকে আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে রাব্বি অভিযোগ করলেও ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে বরাবরই এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছেন।

শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালের মার্চে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ত্বকী হত্যাকা-ে আজমেরী ওসমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সে অভিযোগপত্র আজও পর্যন্ত আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ওই নির্দেশের পরও এখনও পর্যন্ত কোনো রকম সাড়া দেয়নি মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা।

এদিকে প্রতি মাসের ৮ তারিখে ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে মোম প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে এ বিচারের দাবি করে আসছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। এমনকী এই আয়োজন থেকে এখনও পর্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই তারা দাবি তুলছেন, ত্বকী হত্যাকা-ে ওসমান পরিবারই সম্পৃক্ত।

এদিকে রফিউর রাব্বি দাবি করেছেন, ‘আইনগত জটিলতার কারণে ত্বকী হত্যার বিচার আটকে আছে।’ তার মতে, ‘যখন রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের (আসামিদের) পাশে থাকার, পক্ষে থাকার কথা বলা হয়, তখন তাদের (আসামিদের) বিরুদ্ধে বিচার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।’

ওসমান পরিবার সম্পর্কে রাব্বি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন সরকারে থাকে তখন তারা দেশে থাকে, আওয়ামী লীগ যখন সরকারে থাকে না তখন তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়।’

তবে রফিউর রাব্বি বিশ্বাস করেন, এ সরকারের মেয়াদেই তিনি সন্তান হত্যার বিচার পাবেন।

অপরদিকে তিনি এ-ও বলেন, ‘যদি তারা (সরকার) এই বিচার নাও করেন তাহলেও আমি বিশ্বাস করি এই বিচার কোনো না কোনোদিন অবশ্যই হবে। এবং যারা অপরাধী তাদের সাথে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য যারা জড়িত তাদেরও কাঠগড়ায় আসতে হবে।’

অন্যদিকে ত্বকী হত্যার চার মাস পর একই বছরের ৬ জুলাই ঢাকার গুলশান থেকে অপহরণ হয় ওসমান পরিবারের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ও জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ। অভিযোগ করা হয়েছিলো ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। ত্বকী হত্যায় দায়ের করা অবগতিপত্রে পারভেজের নামও রয়েছে।

এদিকে পারভেজ গুমের ঘটনায় একই বছর ১৩ সেপ্টম্বর পারভেজের স্ত্রী খুরশীদ জাহান সোহানা বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন।

মামলায় প্রধান আসামী করা হয় সিটি করপোরেশনের ঠিকাদার আবু সুফিয়ানসহ মেয়র আইভীর ছোট ভাই মহানগরন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আহম্মেদ আলী রেজা উজ্জ্বল, আইভীর মামাতো ভাই রেজাউল ইসলাম রনি, জেলা যুবলীগ সভাপতি আব্দুল কাদিরের ছেলে মিনহাজুল কাদির ওরফে মিমন, জেলা কৃষক লীগ সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দিন আহম্মেদের ছেলে রমেল, বিএনপি নেতা মাহবুব উল্লাহ তপন, সিটি করপোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকুকে।

এঘটনায় পরের বছর জানুয়ারিতে ডিবি পুলিশ সুফিয়ানসহ বেশ কজনকে আটক করে। তারা একমাস কারাভোগের পর জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে।

এদিকে পারভেজ গুমের চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এই রহস্য উদঘাটন করা যায়নি সে কী গুম হয়েছে না খুন অথবা অন্যকিছু? আবার পারভেজ গুমের পর যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন ওসমান পরিবার বর্তমানে সেই সক্রিয়তাও তাদের মধ্যে নেই। পারভেজের সন্ধান পেতে এই পরিবার বা স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকা-ও তৎপর নয়। তাই এ ব্যাপারে অনেকের মনেই নানা প্রশ্নের উদ্রেক করছে। কেন তারা এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না?

আবার পারভেজের পরিবারের পক্ষ থেকেও তার সন্ধান দাবি করে জোরালো কোনো ভূমিকা পালন করছে না। সম্প্রতি পারভেজ নিখোঁজের চার বছরে তার স্ত্রী অনেকটা দায়সাড়া গোছের সংবাদ সম্মেলনে পারভেজেন সন্ধান দাবি করেন। তবে সেটি তেমন একটা জোরালো ছিলো না বলেই অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন।

এদিকে এ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পারভেজ ভালো হোক আর মন্দ হোক, কিন্তু একজন মানুষ এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাবে সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পারভেজর নিখোঁজের রহস্য উদঘাটন হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই কেন? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আসলে সে ছিলো আমাদের সহযোগি সংগঠনের। তাই এ ব্যাপারটা ভালো বলতে পারবে যুবলীগের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি। অভিভাবক দল হিসেবে আমাদের সে সুযোগটা দেয়া হয়নি, আমাদের সেভাবে কিছু জানানো হয়নি। তাই আমরা এগিয়ে আসার সুযোগও পাইনি। তারা কি করলো না করলো এটার সদুত্তরটা তারাই দিতে পারবে।

এ  প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছিলো জেলা যুবলীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদিরের কাছে। তিনি জানান, পারভেজ ছিলো যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা। কেন্দ্র থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। সুতরাং তার দায়দায়িত্ব আমাদের সংগঠনের ওপর বর্তায় না। ফলে এ নিয়ে কোনো রকম মন্তব্য করারও কিছু নেই।

একই ব্যাপারে জানতে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও  তিনি ফোনটি রিসিভ না করায় তার কোনো মন্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম