Fri, 24 Mar, 2017
 
logo
 

দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ন্যূব্জ না.গঞ্জ বিএনপি ‘বহুধা বিভক্ত’॥ মিলন হবে কতদিনে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার মানসে একাধীক গ্রুপ ও উপগ্রুপে বিভক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল থেকে। যার ফলে ‘ত্রিধা’ বিভক্ত নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে ঐক্য ফিরিয়ে আনার বদলে ‘বহুধা’ বিভক্ত করণের কাজ চলছে সুকৌশলে।

দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠি পর্দার আড়াল থেকে এ ভাঙ্গনে কলকাঠি নাড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল থেকে।

বিগত ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির মধ্যকার দ্বন্দ্ব। যা ছিল দলীয় প্রভাব বিস্তার করে সুবিধাভোগের দ্বন্দ্ব। মূলত সেসময়’ই নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ‘ত্রিধা’ বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে ওই নির্বাচনে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে মোহাম্মদ আলীর কারিশমায় সফর আলী ভূইয়াকে ল্যাং মেরে মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন। মনোনয়ন প্রাপ্তির কিছুদিন পূর্বেও তিনি ছিলেন কৃষক লীগ নেতা।

সূত্র বলছে, ওই দ্বন্দ্বের আদ্যপ্রান্তে ছিলেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ)-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। তিনি একদিকে একই দলের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও তৈমূর আলম খন্দকারকে মাইনাস করে জেলাব্যাপী একক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূত্রপাত হয়। সেসময় তিনি তার দলে ভেড়ান সাবেক ছাত্রদল নেতা (বর্তমানে নির্বাসিত) জাকির খানসহ তার চেলাচামু-াদের।

ওই সময় নারায়ণগঞ্জে খুন হন ব্যবসায়ী নেতা ও তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই সাব্বির আলম খন্দকার। যে খুনের অভিযোগের তীর গিয়াসউদ্দিন ও জাকির খানের দিকে তুলেন তৈমূর আলম খন্দকার। মূলত এ হত্যাকা-ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শহর কেন্দ্রীক বিএনপি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। নিজেরাই বিভিন্ন সময়ে জড়িয়ে যান নানা সংঘাত ও সংঘর্ষে।

অপরদিকে ফতুল্লায় একক কতৃত্ব বিস্তার করারকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ আলীর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন গিয়াসউদ্দিন। মূলত সিদ্ধিরগঞ্জের চুন ব্যবসায়ী সুন্দর আলী হত্যাকা- নিয়ে মোহাম্মদ আলীর সাথে গিয়াসউদ্দিনের দ্বন্দ্ব জোড়ালো হয়। সেসময় তিনি মোহাম্মদ আলী সমর্থকদের কাছ থেকে একাধীকবার ধাওয়া খেয়েও পালিয়ে আসেন ফতুল্লা অঞ্চল থেকে। তারপর ফতুল্লায় জুট, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম সংগঠিত করার জন্য বিএনপি নন এমন অনেককে নিয়েই ৪১ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেন সেসময়কার সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন।

ওই সময় ফতুল্লায় মোহাম্মদ আলীর পক্ষ নিয়ে গিয়াস উদ্দিন বিরোধী হওয়ায় অনেক নেতাকর্মীই হামলা-মামলা সহ কারাভোগও করেন। এরমধ্যে তৎসময়কার ফতুল্লাা থানা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলাম, সাধারন সম্পাদক মনিরুল আলম সেন্টু, তৎসময়কার জেলা ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক জাহিদ হাসান রোজেল, ফতুল্লা ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী, কাশীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন খন্দকার শিপন, বক্তাবলী ইউপি চেয়ারম্যান মিলন মেহেদীসহ মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাই মোহাম্মদ আলী’র বলয়ে চলে আসেন।

এদিকে বিএনপি নেতাকর্মী শূন্য হয়ে পড়েন গিয়াসউদ্দিন। তবে তিনি ডেমরা সারুলিয়া এলাকার শরীফ হত্যা মামলার আসামী জামান, সেলিম, পিএস ফজুলল হক ও এপিএস আক্তারের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মোহাম্মদ আলী ও তৈমূর আলম খন্দকার বলয়ের লোকজনদের ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয় এবং ক্ষতিও করেন।

এছাড়াও সেই বিরোধের জের ধরে আকষ্মিক ভাবে গিয়াসউদ্দিন ২০০৫ সালের ৩১ আগস্ট রাতে রিয়াদ চৌধুরী ও রাকিব সুমনের নেতৃত্বাধীন ফতুল্লা থানা ছাত্রদল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কাইল্লা আক্তারকে সভাপতি ও সেলিমকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এর পাশাপাশি ২৬ অক্টোবর একই কায়দায় ফতুল্লা থানা বিএনপি কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিজেকে নিজেই এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা দেন।

গিয়াসউদ্দিনের ওই রকম স্বেচ্ছাচারিতাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে সৃষ্টি হয় চরম অসন্তোষ। হামলা পাল্টা হামলা, মামলা পাল্টা মামলার অসংখ্য ঘটনাও ঘটে সেসময়। আর নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে সৃষ্টি হয় ভাঙ্গনের পর ভাঙ্গন। সেসময় অনেকেই মোহাম্মদ আলীকে ‘খাল কেটে কুমির’ আনার জন্য অভিযুক্ত করেন।

অপরদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিজে ঋণ খেলাপী হওয়ায় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছিলেন না মোহাম্মদ আলী। তবে যে কোন মূল্যে গিয়াসউদ্দিনকে ঠেকাতে হবে। এমন প্রত্যাশা নিয়ে দলের মধ্যে শিল্পপতি শাহ আলমকে ভেড়ানো হয়। এবারও মেকারের ভূমিকায় ছিলেন মোহাম্মদ আলী। এমনকি দলীয় মনোনয়নও এনে দেওয়া হয় তার হাতে। তবে, গিয়াসউদ্দিন আর শাহ আলমের মধ্যে পার্থক্য তেমন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় নি। এরমধ্যে নির্বাচিত হওয়ার পর গিয়াসউদ্দিন আর মনোনয়ন পাওয়ার পর শাহ আলম জড়িয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলীর সাথে দ্বন্দ্বে।

শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দিনকে অনুসরণ করেই ফতুল্লা বিএনপির মধ্যে আরও কয়েক দফা ভাঙ্গন সৃষ্টি করেন শাহ আলম। এরমধ্যে থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে নিজেকেই নিজে সভাপতি ঘোষণা করেন। পাশাপাশি নিজের চাটুকার দিয়ে যুবদল ও ছাত্রদল কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করলেও পরে আর সফল হতে পারেন নি। যার ফলশ্রুতিতে আজো অবধি ফতুল্লা থানা যুবদল ও ছাত্রদল কমিটি গঠন করা সম্ভব হয় নি।

এদিকে সেই অতীত থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে ভাঙ্গন অব্যহত রয়েছে। যা অতীতের থেকেও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। তবে এবার এ ভাঙ্গনের নেপথ্যে কমিটি ও আগামী নির্বাচন টার্গেট। এ দু’টি ইস্যুকে টার্গেট করেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপি এখন ‘বহুধা’ বিভক্ত। চলছে গ্রুপিং। সৃষ্টি হচ্ছে একাধীক গ্রুপ ও উপগ্রুপ। এসব আরও বেশী জোরালো করার জন্য দলীয় চেয়ারপারসেনর বক্তব্য সাজিয়ে পাঠানো হচ্ছে গণমাধ্যমেও।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে একটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। সেই গ্রুপটিই এখন পর্দার আড়াল থেকে নানা কারসাজি করে দলের ভেতর মাইনাসের চেষ্টা তদ্বির করে যাচ্ছে। যার জন্য আগামী স্থানীয় বিএনপিকে চরম খেসারত দিতে হতে পারে।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কমিটি নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এরমধ্যে শাহ আলম ও কাজী মনিরুজ্জামান চাচ্ছে সিটি নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী সাখাওয়াতকে নিয়ে জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটিতে প্রভাব বিস্তার করতে। তবে এর জন্য এ দুই নেতার চিন্তাভাবনা সদূরপ্রসারী।

সূত্র মতে, তাদের মূল টার্গেট আগামী জাতীয় নির্বাচন। এ জাতীয় নির্বাচনে কাজী মনিরের টার্গেট রূপগঞ্জ ও শাহ আলমের ফতুল্লা আসন। এ দুই নেতা আগামী নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন প্রাপ্তির অন্তরায় তৈমূর ও গিয়াসউদ্দিনকে বাধা মনে করছেন। যার কারণে তারা চাচ্ছে না এ দু’জন স্থানীয় বিএনপির কমিটিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করুক। এ ক্ষেত্রে তারা সদর-বন্দর আসন টার্গেট করে সাখাওয়াতকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। যাতে করে ওই দিক থেকে কালামকে ঠেকানো যায়।

এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির প্রস্তাবিত সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস লাইভ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, বিএনপির মধ্যে বিভক্তি অনেক আগে থেকেই। তবে সেটা মাঠের কর্মীদের মধ্যে প্রভাব পড়েনি। নেতারা বিভক্ত থাকলেও কর্মীরা ছিল একাট্টা। আর এখন তার উল্টো। নেতারা টেবিলে এক থেকে কর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যা দলের জন্য ক্ষতিকর।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির শীর্ষ ৩ নেতাকে মাইনাস করা হতে পারে। এ বিষয়টি গুজব কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি গুজব নয়। তবে এ কাজটি করা হলে মোটেও ভালো হবে না। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন পুরনো মিলিয়েই কমিটি গঠন করা দরকার।

কাজী মনির ও শাহ আলম নেপথ্যে থেকে মাইনাস প্রক্রিয়ার কলকাঠি নাড়ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা হতেও পারে। কেন না, রাজনীতিতে অনেক খেলাই চলে। এটাও তার’ই অংশ। তবে, দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিংয়ের মূলেই হচ্ছে কমিটি ও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন। যা মাঠের রাজনীতিতে প্রভাব পড়েছে। খালেদা জিয়া ছাড়া এ দ্বন্দ্ব নিরসন করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানিয়েছেন, আমাদের দলে কোন দ্বন্দ্ব নেই। তবে নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা রয়েছে। যা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হলে এটুকু থাকবে না। দলের স্বার্থে আমরা সব এক আছি।

গিয়াসউদ্দিন ও শাহ আলমকে দলে টেনে আনা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলীর কোন ভুল ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি (মোহাম্মদ আলী) আমাদের দলের সাবেক এমপি। বেগম জিয়ার মনোনিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যা করেছেন তা দলকে শক্তিশালী করার জন্যই করেছেন। এতে তিনি কোন ভুল করেন নি। বরং দলের স্বার্থেই দলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করেছেন।

এছাড়াও ২০০১ সালে গিয়াসউদ্দিন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর একদিকে মোহাম্মদ আলী অন্যদিকে তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যান। এ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এটিএম কামাল তাদের এ দ্বন্দ্বকে ব্যক্তিগত উল্লেখ করে কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪