Fri, 24 Mar, 2017
 
logo
 

সামনে এগিয়ে যাওয়া ‘প্রেরণা’ আইভী

সীমান্ত প্রধান, লাইভ নারায়ণগঞ্জ : গণ-মানুষের নেতা ছিলেন আলী আহম্মদ চুনকা। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের পৌর পিতা। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে তিনি সম্পৃক্ত থাকলেও দলমত নির্বিশেষে শহরবাসী সবাই ছিল তার আত্মার আত্মীয়।

গণ-মানুষের নেতা, সেই বাবার রক্ত যার ধমনিতে প্রবাহিত তার মেয়ে হয়ে ব্যাতিক্রম কী করে হবেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী?

বাবার পুরো কার্বন কপিই যেন মেয়র আইভী। কিংবা বাবা আলী আহম্মদ চুনকাকেও ছাপিয়ে গেছেন তিনি। যার ফলে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের গ-ি পেরিয়ে পুরো দেশজোড়া পেয়েছেন আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তার খ্যাতি। অনেকের কাছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ‘প্রেরণা’ তিনি। কেউ কেউ তো বলেই ফেলেন, ‘আমি আইভীকে দেখেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পেয়েছি’।
সামনে এগিয়ে যাওয়া ‘প্রেরণা’ আইভী
আইভীকে ঘিরে আজ (৯ জানুয়ারি) শহরময় ছিল এমন আলোচনা। দ্বিতীয় মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে আজ তিনি দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। সকাল সাড়ে ১০ টায় তিনি তার পৈত্রিক নিবাস পশ্চিম দেওভোগ থেকে বের হয়ে দুই নম্বর গেট ঘুরে পায়ে হেঁটে নগর ভবনে আসেন। এসময় তাকে ঘিরে ছিল বাধভাঙ্গা জনতার ¯্রােত আর অঝোর ধারায় ফলের বৃষ্টি।

আইভী বাসা থেকে বের হবেন, আজ নগর ভবনে যাবেন পায়ে হেঁটে। এমন খবর আগে থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। সেই খবরের সূত্র ধরেই হাজারো জনতা সকাল থেকেই তার বাসার সামনে এসে জড়ো হতে থাকে। এরা সকলেই বিভিন্ন দল-মতের সাধারণ মানুষ। তারা রাজনীতি বুঝে না। তারা দল বুঝে না। তারা সকলেই আইভী নামে অজ্ঞান।
সামনে এগিয়ে যাওয়া ‘প্রেরণা’ আইভী
একজন মানুষকে কতটা ভালোবাসলে দলমত নির্বিশেষে একজন মানুষকে ঘিরে আপমর জনতার ¯্রােত বইতে পারে (!) তা চোখে না দেখলে কারোরই বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। তাকে ঘিরে পুরো শহর ছিল আজ উৎসবের নগরী। অনেকেই এসেছিলেন নানা বাদ্য-বাজনা, ফুলের তোড়াসহ আইভীর ছবি সম্বলিত বড় বড় ফেস্টুন নিয়ে। কেউ কেউ দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন আইভীকে একনজর দেখার জন্য।

নারায়ণগঞ্জ, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা তিনটিকে একিভূত করে গঠন করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবার সন্তান শামীম ওসমানকে। আইভী এতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লক্ষাধীক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে।

এর আগে ১৯৭৪ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েও ব্যর্থ হন আলী আহম্মদ চুনকা। সে সময় বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় খোকা মহিউদ্দিনকে। আর সেই মনোনয়নের নেপথ্যে ছিলেন শামীম ওসমানের পিতা একেএম সামসুজ্জোহা। তবে, ওই সময় আলী আহম্মদ চুনকাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া না হলেও বঙ্গবন্ধু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘যা, তোকে দোয়া করে দিলাম’। অনেকের কাছে ২০১৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল সেই ১৯৭৪ সালের প্রথম পৌরসভা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি।

সে নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন আলী আহম্মদ চুনকা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৪০ বছর। সময় আসে আইভীর। বাবার দেখানো পথেই চিকিৎসা পেশা ছেড়ে নিজেকে বিলিয়ে দেন নগরবাসীর সেবায়। হয়ে উঠেন নগরবাসীর কাছে দলমত নির্বিশেষে জনতার নেত্রী।
সামনে এগিয়ে যাওয়া ‘প্রেরণা’ আইভী
তবে, আইভীর দীর্ঘ এ পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে রাজপথে। কখনো কথার যুদ্ধ, কখনো কৌশলের যুদ্ধ আবার নগরবাসীর জন্য উন্নয়নের যুদ্ধটাও করতে হয়েছে তার। তারপরও থেমে যান নি। একাগ্র চিত্তে এগিয়ে গেছেন তিনি। আবারও মেয়র হয়ে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করারই শপথ নিলেন। বিজয় উৎসর্গ করলেন বঙ্গবন্ধু ও দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

তিনি কথাও দিয়েছেন, নাওয়া-খাওয়া ভুলে অগণিত মানুষের সমস্যার পাহাড় নিয়ে সমাধান খুঁজে বেড়াবেন। তবে পেছনে রেখেছেন অলৌকিক উত্থানের গল্প- যা বাস্তব করেছেন চুনকার আদর্শে গড়া তারই মেয়ে। সময়ে ফেরে জিতে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসীর মন।

১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ভোররাতে মারা গেছেন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান আলী আহম্মদ চুনকা। আইভী তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। ৫ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। চুনকার মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সৃষ্টি হয় শূন্যতা। তখনই আইভী মন:স্থির করলেন, বাবার দেখানো পথেই চলবেন।

১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে আইভী সম্পৃক্ত হন পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় ফেরার পর। সময় মিটফোর্ড হাসপাতালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করাকালিন নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তারই রেশ ধরে খুন হয় দেওভোগ এলাকার যুবলীগের নেতা আলম। এর ঠিক চারদিন পরই খুন হন সোহেল। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে আইভী আগে কখনোই পরিচিত ছিল না। তাই কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যান। তখন তিনি বলছিলেন, ‘আমার বাবার সঙ্গেও দ্বন্দ্ব ছিল কারও কারও, কিন্তু তা ছিল আদর্শিক। রক্তপাতের দ্বন্দ্ব ছিল না’। তিনি ভাবলেন, আমি লেখা-পড়া করে রক্তপাতের রাজনীতি করবো? এমন দ্বন্দ্বে পড়ে যান আইভী। যার ফলে তিনি স্বামী কাজী আহসান হায়াতের সঙ্গে চলে যান নিউজিল্যান্ড।
সামনে এগিয়ে যাওয়া ‘প্রেরণা’ আইভী
বিদেশ গিয়ে পড়ালেখা শুরু করলেন। এরমধ্যেই জন্ম তার কোলজুড়ে জন্ম নিলো প্রথম সন্তান কাজী সাদমান হায়াৎ। নিউজিল্যান্ডে ইমিউনোলজি অ্যান্ড ব্লাড ট্রান্সফিউশনের ওপর স্নাতকোত্তর শুরু করেন পড়াশোনা। একদিকে সন্তানের দেখাশোনা অন্যদিকে পড়াশোনা, এ দুই নিয়েই বেশ ভালো কাটছিল তার। লেখাপড়া প্রায় যখন শেষের দিকে; তার কোল আলো করে আসে দ্বিতীয় সন্তান কাজী সারদিল হায়াৎ। এরই মধ্যেই বাড়ি থেকে তার ছোটভাই আলী রেজা উজ্জ্বল ফোন করে বলেন, ‘আপা, নির্বাচনের (পৌরসভার নির্বাচন ২০০৩ সাল) শিডিউল ঘোষণা হয়েছে, পরশু মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। যদি নির্বাচন করতে চাও, এখনই চলে আসো’।

এরপর থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিকাঙ্গনে আইভীর ধারাবাহিক পথচলা। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলাম সর্দারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিন হন। বসেন পৌর-মাতার আসনে। এরমধ্য দিয়ে দেশের প্রথম নারী পৌর চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরবও অর্জন করেন তিনি।

সেই থেকে শুরু, এরপর উন্নয়ন আর দলমতের উর্ধ্বে উঠে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভালোবাসা জয় করে নেন আইভী। সেই ভালোবাসাই তাকে আজ শিকড় থেকে শিখরে পৌছে দিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জোড়ালো অবস্থানের কারণে দেশজোড়া পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

সেই ধারাবাহিকতায় এবারও নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে মেয়র ডা. সেলিনা হায়ৎ আইভী বলেছেন, ‘আমি দলমতের উর্ধ্বে উঠে শুধু কাজ করতে চাই। নগরবাসীর সেবা করতে চাই। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আগের মত অবস্থান থাকবে আমার’।

২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বও মেয়র পদ থেকে পদত্যাগের পর নগর ভবন থেকে হেঁটে নগরীর ২ নং গেটস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালে গিয়েছিলেন আইভী। সে সময়ও তার সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ঢল। একইভাবে সকাল সাড়ে ১০ টার সময় মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তার দেওভোগস্থ পৈত্রিক বাড়ি থেকে বের হয়ে ১১টা ১০ মিনিটে নগর ভবনে পৌঁছেন। এরপর এখানে তিনি অপেক্ষামান জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।

তিনি সবাইকে আশ্বাস্ত করে বলেন, আমার পিতা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও দলমত নির্বিশেষে সবার সাথে তার ছিল আত্মার সম্পর্ক। আমার বাবা যেমন নারায়ণগঞ্জবাসীর সাথে কোন বেঈমানি করে নি, আমিও তার মেয়ে হিসেবে কারো সাথে বেঈমানি করবো না। আমিও দলমতের উর্ধ্বে এসে সবার মেয়র হতে চাই। নগর ভবন হবে সার্বজনীন।

এর আগে ২২ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাড. সাখাওয়াত হোসেনকে প্রায় ৭৯ হাজার ভোট ব্যবধানে পরাজিত করেন তিনি। ৫ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শপথ নেওয়ার ৪ দিনের মাথায় তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নগর অভিভাবকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম ২৪